27/06/2021
১৭ ০৬ ২০২১ দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় প্রচারিত হয়েছে
ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( টোয়াব )
#প্রেসিডেন্ট এর মতামত .
বিস্তারিত: করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন। দেশের পর্যটনস্থল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট সবাই বেকায়দায়। তারা আশা করেছিলেন, বাজেটে বুঝি এ খাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু বাজেটে এ খাতের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা বা উন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেখা যায়নি। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) মনে করছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া এ খাতের গতি ফিরবে না। এ বিষয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন সংগঠনটির সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাওহীদুল ইসলাম
আমাদের সময় : প্রস্তাবিত বাজেটে পর্যটন খাতের বরাদ্দ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. রাফেউজ্জামান : পর্যটন কেবল করোনা নয়, যে কোনো অনুকূল পরিবেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো সমস্যা বা অসুবিধা সব ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথমে ধাক্কা খায় পর্যটন খাত। মানুষের মন, চিন্তাচেতনা স্বাভাবিক থাকলে, অস্থিরতা না থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে বের হন। করোনা সংক্রমণের কারণে সারাবিশ্বে এমন একটা বিপর্যয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও এত আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। অন্যসব শিল্পের চাকা ঘুরলেই কেবল পর্যটন খাত সচল থাকে। এক নাগাড়ে সব কিছু শান্ত মেজাজ ও পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে পর্যটন খাত চলতে পারে। নতুবা নয়। গত বছরের করোনার কারণে পর্যটনের সঙ্গে জড়িতদের সবার ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুধু টোয়াব সদস্যদের ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ থেকে সব কিছু স্থবির হওয়ায় পর্যটন খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।
চলমান পরিস্থিতি আগামী ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বর্ধিত হলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। এবারের প্রস্তাবিত বাজটে এ খাতে ৪ হাজার ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের বাজেটের চেয়ে ৩৪৪ কোটি টাকা বেশি। আমি মনে করি, এই বরাদ্দ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য খুবই যৎসামান্য। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিকাশের কথা বলেছেন, কিন্তু খাতটিকে আর্থিক সংকট থেকে বের করে আনার বিষয়ে কোনো প্রকার দিকনির্দেশনা খুঁজে পাইনি। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় জানি এর মধ্যে ৯০ শতাংশ খরচ হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সিভিল এভিয়েশন অথরিটিসহ অন্যান্য খাতে। গত বছর পর্যটনের ওপর শুধু ৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ ৫০ কোটির কম বরাদ্দ হয়, যা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) তাদের ফেয়ার, কর্মকর্তাদের যাতায়াতে খরচ করে। ট্যুরিজম বোর্ড সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার জন্য। এটি বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই টোয়াব সদস্যরা করে যাচ্ছিলেন।
পর্যটন খাতে বাজেট বরাবরই যৎসামান্য। আমরা সে কারণে আপনাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে চাই, পর্যটন নিয়ে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠনের। তা না হলে অগ্রাধিকার পাবে না পর্যটন খাত। এভিয়েশন বা অন্য সংস্থার ভিড়ে উপেক্ষিত থাকবে। যে দেশ পর্যটনে উন্নত, সে দেশ তত সমৃদ্ধ। উন্নত বিশ্ব ইউরোপ, আমেরিকা বা ন্যাটোভুক্ত দেশ উন্নত। এমনকি সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ বেশি মাত্রায় আয় করে পর্যটন খাতে, সেসব দেশ সমৃদ্ধ। নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ভারতে অগ্রাধিকার পায় পর্যটন খাত। অথচ বাংলাদেশ পিছিয়ে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আপামর জনসাধারণ অতিথিপরায়ণ। ঋতুবৈশিষ্ট্যের কারণেই এ দেশ পর্যটনে এগিয়ে থাকার কথা। দেখা যায়, বেসরকারি উদ্যোক্তা পর্যায়ে ট্যুরিজম খাতে ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ইনভেস্টমেন্ট আছে। কোনো কোনো রিসোর্ট রুমপ্রতি রাতের জন্য ৩০০ ডলারের অধিক বিল পায়। তা ছাড়া প্রতি বেলার খাবারেও ২০০ ডলারের বেশি বিল হতে পারে। তবু রুম খালি থাকে না স্বভাবিক সময়ে।
এতকিছুর পরও পর্যটনবান্ধব মন্ত্রণালয় নেই, পর্যটনবান্ধব সরকারি সংস্থা নেই, কর্মকর্তা নেই। ট্যুরিজম বোর্ড তেমন কিছুই করতে পারে না। বিটিবি গঠন হয়েছে ২০১০ সালে। অথচ ১৯৭১ সাল থেকে ২০১০- এই ৪০ বছর ট্যুরিজম সেক্টরকে একাই প্রমোট করে গেছে টোয়াব। সারাবিশ্বে আমরা ব্র্যান্ডিং করেছি। আমাদের স্ব-ইচ্ছায় ও প্রচেষ্টায় এতদূর অগ্রগতি। যদিও ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যুরিজম সেক্টরের ওপর পড়ানো হয়। আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালি বিভাগের ছাত্র। অথচ পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পর্যটনবান্ধব কর্মকর্তা নেই। পর্যটন বোর্ডে একজন কর্মকর্তা দুই বছর অবস্থান করে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার পর অন্যত্র বদলি হয়ে যান। এর পর অবার আরেকজন আসেন। তিনিও পর্যটন খাত সম্পর্কে অবহিত বা সম্যক ধারণা লাভের পর যখন বাস্তবায়নে যাবেন, তখনই আরেকজন কর্মকর্তা চলে আসেন। এভাবেই চলছে সরকারের পর্যটন খাত। সে কারণেই বলছি, পর্যটন করপোরেশন ও পর্যটন বোর্ড চালানোয় শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পর্যটনবান্ধব সিদ্ধান্ত আসে না। গত দুই বছরে করোনায় পর্যটন স্পট বন্ধ। হোটেল-রিসোর্ট সব বন্ধ। অথচ কোনো রেয়াত পাইনি। কোনো ছাড় নেই, ব্যবসা নেই, অনুদান নেই, সাহায্য নেই। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হয়ে পড়েছি বিপদে। কারণ টোয়াব মেম্বাররা সব সময় আমাদের জিজ্ঞেস করেন কী করব। সংগঠনের দায়িত্বশীল হয়েছি ঠিক, কিন্তু পাশে দাঁড়াতে পারছি না। বিটিবির সঙ্গে আমরা বহু মিটিং করেছি। কথা কেবল বলেই যাচ্ছি। তারা আমলে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে শোনেন না বা শুনতে পারেন না। দেখুন, বর্তমানে সব গণপরিবহন ও মার্কেট খোলা। কিন্তু পর্যটন খাত বন্ধ। সেদিন সংবাদ সম্মেলন করে বললাম, জগতের সব যেহেতু খোলা, তাই অনুগ্রহ করে পর্যটন স্পট সীমিত আকারে হলেও চালু করে দেন। আমরা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করি।
সাজেক, শ্রীমঙ্গলসহ কিছু এলাকা গড়ে উঠেছে শুধু পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে। এসব এলাকার বিদ্যমান দশা চিন্তা করুন। দুই বছর ধরে বন্ধ সব কিছু। তাদের রেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এসব মানুষ কী বিপদে আছে ও তাদের সংসার কেমনে চলছে, তা দেখার কেউ নেই। এই দুঃসময়ে ট্যুর অপারেটরদের কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা দূরের কথা, কেউ কথাও বলেনি এখন পর্যন্ত। এমন কোনো গণমাধ্যম নেই গুরুত্বসহকারে ছাপেনি পর্যটন খাতের দুরবস্থা নিয়ে। আমার খুব ইচ্ছা ও আবেদন, প্রধানমন্ত্রী পর্যটন খাতের এই দুরবস্থার নিরসনে দেখবেন। তিনি নিজেই ব্যবস্থা নেবেন এ খাতকে সমৃদ্ধ করতে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ওনার চোখে পড়লে পর্যটন খাত গুরুত্ব পাবে। বলে রাখা ভালো, একটি পর্যটন এলাকা গড়ে উঠলে ১১৯ শ্রেণির মানুষ উপকৃত হয়। পর্যটক শুধু ওই এলাকায় গিয়ে রুমে ঘুমান না, তার খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা সব কিছুর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকে। বাদাম খান, ঘোড়ায় ওঠেন, এন্টারটেইনমেন্ট করেন। অথচ এই ইন্ডাস্ট্রির দেখভাল নেই।
আমাদের সময় : পর্যটন বোর্ডের মাধ্যমে তো মাস্টারপ্ল্যানও করা হয়েছে। সেখানে নিশ্চয় এ খাতের রূপরেখা আছে?
মো. রাফেউজ্জামান : আমি টোয়াব সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মেম্বার। পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান করেছে ট্যুরিজম বোর্ড। এটি মাস্টারপ্ল্যান কাগজ নয়, একটা ঠোঙা। অথচ ৩৬ কোটি টাকা নিয়ে নেবেন পরামর্শকরা। সবাই জানেন, ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ের সচিব। আমরা প্রতি মিটিংয়ে বলি, মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বাস্তবতার বাইরে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা রয়েছে সেখান। কিন্তু সেকেন্ডারি ইনফরমেশন নিয়ে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং সার্ভে ছাড়া এই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে। পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, সাংবাদিক, স্থানীয় মানুষ, বিশেষজ্ঞ কারও সঙ্গে কথা না বলে বিদেশে বসে একটি কাগজ তৈরি করা হয়েছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার ন্যূনতম মিল নেই। কিছু টাকা নিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। বাকি টাকা যেন না নিতে পারে, সে জন্য আপত্তি জানিয়েছি।
আমাদের সময় : পর্যটন খাতের বরাদ্দকৃত বাজেট নিয়ে আপনাদের আপত্তি, নাকি এ খাতের উন্নয়নে সরকারের তদারকির ঘাটতি দেখছেন?
মো. রাফেউজ্জামান : পর্যটন খাতের বাজেট নিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের আহাজারির খবর পৌঁছানোই এখন জরুরি। কেউ যদি কোনোভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে পারতেন বিষয়টি, তবেই সমাধান হবে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া পর্যটন খাতের নাজুক পরিস্থিতি দূর হবে না। আমরা অল্প টাকাতেই তুষ্ট। স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় ছাড়া পর্যটন খাতের দুরবস্থা দূর হবে না।
আমাদের সময় : তবু বাজেট নিয়ে আপনাদের চাওয়া স্পষ্ট করতে পারেন।
মো. রাফেউজ্জামান: পর্যটন খাতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা দরকার। পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, রেল, নৌ, সড়ক পরিবহনসহ ১৩ থেকে ১৪টি মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত। যাতায়াতব্যবস্থা সহজ না করলে পর্যটক আসবে না। কক্সবাজার, টাঙ্গুয়ার হাওর ও কুয়াকাটা এসব স্থানে ম্যাস ট্যুরিজম দরকার। নেপাল, ভুটান তাদের পাহাড় আছে সমুদ্র নেই। পর্যটকরা সরাসরি যেন কক্সবাজারে আসতে পারেন।
এ জন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জরুরি। আমাদের সমুদ্র, পাহাড় সবই আছে। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। সারাবিশ্বে এরচেয়ে সুন্দর জায়গা কোথাও নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া পর্যটন খাতের উন্নতি সম্ভব নয়। এতে করে দেশের বেকারত্ব ঘুচবে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে। স্পটে যাতায়াতব্যবস্থা চলাচলের উপযোগী করলে বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগটি এই বাংলাদেশ হবে সারাবিশ্বের মধ্যে সেরা মডেল। পর্যটন খাতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি উপার্জনের সুযোগ নেই অন্য দেশে। বিদেশিরা এ দেশে এসে বিনিয়োগ করবেন। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা কোনো বাজেট? কেবল পর্যটন মন্ত্রণালয় নয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়ও আছে এখানে। পর্যটন স্পটের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতাও দরকার হবে। মনে রাখা দরকার, পর্যটন এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।