25/07/2018
হজ্জের মর্ম ও আধ্যাত্মিকতা
ইসলাম শান্তি ও শৃংখলার ধর্ম। প্রতিটি সৃষ্টি শান্তির প্রত্যাশী। তাই নিখিল সৃষ্টির স্বভাব ধর্ম ইসলাম। আদি পিতা ও নবী হযরত আদম (আ) এর ধর্ম ছিল ইসলাম। এ ধর্মের মূলনীতি হলো মহান আল্লাহকে এক ও লা-শারীক জানা ও ‘ইবাদতের সকল কর্মকান্ডের মাধ্যমে তা প্রমাণ ও বাস্তবায়ন করা। বলা বাহুল্য, হজ্জ শীর্ষ স্থানীয় ‘ইবাদত। ‘ইবাদতের অর্থ হলো, আকসা গায়াতিত তা জাল্লুলি ওয়াল খুদুয়ি, অর্থাৎ স্রষ্টার ‘ইবাদত ও সৃষ্টির খিদমতে মহান আল্লাহর সমীপে নিজের জান ও মালকে চূড়ান্তরূপে সমর্পন করা ও নিজের অক্ষমতা, দীন-হীনতা প্রকাশ করা। ‘ইবাদতের এ সংগার নিরিখে সর্বশেষ স্তরে তথা নিরংকুশ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের ‘ইবাদত হজ্জ ছাড়া অন্য কোন অনুষ্ঠানে পরিলক্ষিত হয় না।
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্জ হচ্ছে সর্বোত্তম, আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম একটি। হজ্জের আভিধানিক অর্থ হলো, সংকল্প করা বা ইচ্ছা করা। পারিভাষিক অর্থ হলো, নির্দিষ্ট স্থানে (বায়তুল্লাহ) নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কর্মের মাধ্যমে জিয়ারত করাকে হজ্জ বলে। হজ্জের সংক্ষিপ্ত কর্মসূচী হলো, ইহরাম বাধা, কাবা - বায়তুল্লাহকে তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়ায় সায়ী করা, আরাফার ময়দানে ওকুফ বা অবস্থান করা, মুজদালিফায় রাত্রিযাপন, মিনার জামারায় শয়তানকে পাথর মারা, কুরবানী করা, মাথা মুণ্ডান বা চুল কর্তন করা, দশ জিলহাজ্জ হতে বার জিলহাজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে তাওয়াফুজ জিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ করা এবং মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে বিদায়ী ওয়াজিব তাওয়াফ আদায় করা ইত্যাদি কর্মসমষ্টিকে হজ্জ বলা হয়।
মহান আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ) কে মানুষের মধ্যে হজ্জে আসার ঘোষণা দিতে বলেন। যেমন, আল্লাহর বাণী: এবং মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা করে দাও। তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীনকায় উট সমূহের পিঠে; তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে (সূরা হাজ্জ, ২২:২৭)। তিনি আরো বলেন: তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ ও ওমরা পরিপূর্ণভাবে আদায় কর (সূরা বাকারা, ২:১৯৬)। হযরত ইবরাহীম (আ) জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রভূ! আমার আওয়াজ কতদূর পর্যন্ত পৌছবে! তখন আল্লাহ বলেন, তুমি হজ্জের আহবান জানাও, আমি আলমে আরওয়াহ বা রুহের জগতে, মাতৃগর্ভে যারা আছে এবং অনাগতদের কানে এ আহবান পৌছে দেব। এ আহবানে যারা যতবার “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” বলেছে, তাদের ততবার হজ্জ করার সৌভাগ্য হবে।
পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘরের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন: মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ নির্মিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়, উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী (সূরা আল ইমরান, ৩:৯৬)। হযরত আদম (আ) সর্বপ্রথম ফেরেশতাগণের সাহায্যে সপ্তম আসমানের বায়তুল মামুরের নকশায় কাবাঘর বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেন ও হজ্জ আদায় করেন। হযরত নূহ (আ) এর কালে প্রবল প্লাবনে (তুফান) বায়তুল্লাহ হারিয়ে গেলে আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)- এ দুই পিতা পুত্র একত্রে বায়তুল্লাহ পুন:নির্মান করেন। যে পাথরের ওপর পা রেখে ছাদ পর্যন্ত উঁচু ঘর নির্মান করেন সেটির ওপর তাঁর পদচিহ্ন সুরক্ষিত রয়েছে। তার নাম ‘মাকামে ইবরাহীম’। ঘর প্রস্তুত হলে ইবরাহীম (আ) এ বলে দু‘আ করেন, “হে আমার রব! আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত কর এবং আমাদের বংশধর হতে তোমার এক অনুগত উম্মত করিও আর আমাদেরকে ‘ইবাদতের নিয়ম কানুন দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু (সূরা বাকারা, ২:১২৮)।
হজ্জের মধ্যে পার্থিব বা বৈষয়িক ও অপার্থিব মহা কল্যাণ অন্তর্নিহিত আছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো- “যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযিক হিসেবে দান করেছেন তার ওপর নির্ধারিত দিন গুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে (সূরা হাজ্জ, ২২:২৮)। তিনি আরো বলেন- “উহাতে অনেক সুষ্পষ্ট নিদর্শন আছে যেমন মাকামে ইবরাহীম এবং যে কেহ সেখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য এবং কেহ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন (সূরা আল ‘ইমরান, ৩:৯৭)।
মহান আল্লাহ বলেন: “এবং সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন কাবা গৃহকে মানবজাতির মিলন কেন্দ্র এবং নিরাপদ স্থান করেছি (সূরা বাকারা, ২:১২৫)।
হজ্জে মাকবুল বা কবুলকৃত হজ্জ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- হজ্জে মাবরুর বা মাকবুলের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয় (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
হজ্জ আদায় না করার পরিণতি সম্পর্কে নবী (সা) বলেন- যে ব্যক্তি শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্বেও হজ্জ আদায় না করে মারা যায়, সে ইয়াহুদী অথবা নাসারা অবস্থায় যাক, আমি তার দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত (বায়হাকী ও মিশকাত- পৃ.৩৪৪)।
হজ্জ পালনে দারিদ্রতা বিদূরীত হয়ে যায় এবং হাজী স্বাবলম্বী হয়। এ প্রসঙ্গে নবী (সা) বলেন, লোহার মরিচা যেমন কামারের ভাপরে ঝরে যায়, তেমনি হজ্জ গোনাহ ও দারিদ্রতাকে বিদূরীত করে। হজ্জ হলো বিশ্ব মুসলিমের মহামিলন কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষাভাষির, বিভিন্ন বর্ণের ও বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে ভাবের বিনিময় করে জ্ঞান বৃদ্ধি করে। মহান আল্লাহ দেশ ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। আর তা হজ্জের সফরে অর্জিত হয়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও একতা ও ঐক্যের বিস্ময়কর দৃশ্য বিরাজ করে। এ মহা সম্মেলনে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সাম্য, মৈত্রী ও অকৃত্রিম ভালবাসার বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়।
হজ্জের প্রকৃত তত্ত্ব ও মহান লক্ষ্য হলো এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতা। আর এটির ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতা সুদূরপ্রসারী ও অপার্থিব মহাজাগতিক। ইহরামের কাপড় পরিধান দ্বারা কাফন পরা, তাওয়াফ দ্বারা নামায আদায় ও স্বয়ং এ ঘরের মালিক আল্লাহকে তাওয়াফ করা, সায়ী দ্বারা হযরত হাজেরা (আ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) এর স্মৃতিচারণ করা, আরাফার ময়দানে উপস্থিতি ও অবস্থানকে কিয়ামতের মাঠে মহান আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে জীবনের কৃতকর্মের হিসাব দেয়া, মুজদালিফায় ক্রন্দন পাপাচার ও কলুষ কালিমা হতে প্রমুক্তি, মীনার জামরায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা দ্বারা মনের শয়তান ও নফসে আম্মারাকে চিরতরে চূরমার করে দেয়া, কুরবানী করা দ্বারা নিজেকে জবেহকৃত মুর্দা হওয়ার উপলব্ধি করা ইত্যাদি হজ্জের নিগূড় তত্ত্ব ও মর্মকথা এবং মহান উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সদ্য হজ্জ সম্পাদনকারী জনৈক মুরীদকে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (র) জিজ্ঞাসা করলেন, হজ্জের ইহরাম বাঁধার সময় স্রষ্টা ও সৃষ্টির হক আদায় করে, হালাল খাদ্য ও কাপড় পরিধান করে নামাযের নিয়্যাতের ন্যায় কি তুমি ইহরাম বেঁধেছিলে? মুরীদ উত্তর দিল: না, তা তো করিনি। জুনায়েদ বাগদাদী (র) বললেন, তোমার ইহরাম বাঁধাই হয়নি। অত:পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাওয়াফ করার সময় তোমার কি মনে হয়েছিল তুমি এ ঘরের মালিক আল্লাহকে তাওয়াফ করছো? মুরীদ উত্তর দিল: না। জুনায়েদ বাগদাদী (র) বললেন, তোমার তাওয়াফও হয়নি। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের সময় তোমার কি মনে হয়েছিল, তুমি আল্লাহর সামনে হিসাব দিচ্ছ? মুরীদ বলল: না। জুনায়েদ বাগদাদী (র) বললেন: তোমার ওকূফে আরাফাও হয়নি। অত:পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: মিনার জামরায় পাথর মারার সময় মনের শয়তান ও নফসে আম্মারাকে চিরতরে মেরে ফেলার ধারণা কি তোমার মনে উদয় হয়েছিল? মুরীদ বলল, না। জুনায়েদ বাগদাদী (র) বললেন: তোমার পাথর নিক্ষেপ হয়নি। কুরবানী করার কালে ইসমাঈল (আ) এর নিজের কুরবানী হওয়ার ঘটনা এবং তোমার নিজের আমিত্বকে চিরতরে কুরবানী করে দেওয়ার কথা কি স্মরণ হয়েছিল? মুরীদ উত্তর দিল, না। পরিশেষে বাগদাদী (র) বললেন: তোমার হজ্জই হয়নি।
হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এর মধ্যে সুপ্ত আছে মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের নিবিড় যোগসূত্র। কেননা, আল্লাহ তায়ালা মানুষের বাহ্যিক দিককে দেখেন না বরং অন্তর্যামী মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরের অবস্থাকে নীরিক্ষণ করেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: “আল্লাহর নিকট পৌছায়না তাদের গোশত এবং রক্ত বরং পৌছায় তোমাদের তাকওয়া [আল্লাহ ভীতি], (সূরা হাজ্জ, ২২:৩৭)। হজ্জ সফরের সবসময় দু‘আ কবূল হলেও বিশেষ সময়ে ও বিশেষ স্থানে দু‘আ দ্রুত কবূল হয়ে থাকে। যেমন বায়তুল্লাহর মাতাফ বা চত্তরে, মাকামে ইবরাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে, হাতিমে, সাফা ও মারওয়ার সায়ীর স্থানে, আরাফার ময়দানে, মুজদালিফায়, মীনায়, জামরায় পাথর নিক্ষেপের সময়, যমযম পানি পান কালে, জান্নাতুল মু‘য়াল্লায়, মসজিদে নববীর (সা) রওজা মুবারক ও মিম্বরের মাঝামাঝি ‘রওজাতুম মিন রিয়াদিল জান্নাতে’। জান্নাতুল বাকী, শুহাদায়ে উহুদ প্রভৃতি জিয়ারতে বিশেষ বরকত ও কল্যাণ লাভ হয়। মসজিদে কুবায় দুই রাকআত নামায আদায়ে ওমরার সাওয়াব লাভ হয়। হালাল দ্রব্য ভক্ষণ, মিথ্যা বর্জন ও নির্জনে একনিষ্ঠ মনে আকুতি মিনতি সহকারে কাঁন্নাকাটি করলে এবং দু‘আর পূর্বাপর দরুদ শরীফ পাঠ করলে যে কোন দু‘আ আল্লাহর নিকট দ্রুত কবূল হয়। পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় সর্বাপেক্ষা বেশী আদব ও বিনয় দেখাতে হবে।
ফেরেশতা, আম্বিয়া, আউলিয়া তথা পূণ্যবানদের পদরেণু ও পদচারণায় ধন্য পূণ্য ভূমিতে মহান আল্লাহ হাজীদেরকে হাযির করে তাঁদের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে নিজেদেরকে সংশোধন করার সুযোগ দান করেছেন। একই দেশে, একই বেশে, একই পরিবেশে সকলে একত্রিত হন। সেখানে থাকেনা ফকির-বাদশা, ধনী-গরীব, উঁচু-নীচু, সাদা-কালোর ভেদাভেদ। সাম্য-মৈত্রী ও বিশ্বভ্রাতৃত্বেও পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের এমন অভিনব দৃশ্য পৃথিবীর কোথাও অতীতে হয়নি এবং অনাগত ভবিষ্যতেও হবে না। আমিত্বের ও পশুত্বের শেষ চিহ্নটুকু অন্তর থেকে মুছে ফেলে হাজী যখন তার অন্তর রাজ্যের আয়নায় কেবল প্রভূর নূর অবলোকন করবে, তখনি হজ্জ কবূল ও মঞ্জুর হবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল কর্তৃক স্বীকৃত, বাঞ্ছিত ও কাংখিত আদর্শ ব্যক্তিটির দিকে জাতি চেয়ে আছে।
- প্রফেসর ড. এ. আর. এম. আলী হায়দার মুর্শিদী, সুপারনিউমারারী প্রফেসর, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা।