18/01/2016
এটা একটা ভোরের গল্প, ঠিক ভোর নয়, আসলে সকাল। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহর। শহর বলতে আমরা যেমন বুঝি ঠাসা ঠাসি বাড়ি ঘর, গাড়ি, ঘোড়া, ভ্যাপু, ভ্যাপু। মোটেই সেরকম নয় বার্ন। শান্ত, নিরিবিলি, ছিমছাম এবং পরিপাটি। মনে হয় একটা বড় বাগানের মাঝে মধ্যে কেউ কিছু বাড়ি ঘর বানিয়েছে হিসেব করে। হাতে গোনা কয়েকটা মানুষ। অন্ততঃ আমাদের চোখে দেখতে গেলে হাতে গোনাই।
সেই শহরের এই রকম হাতে গোনা কয়জন মানুষের একজন আবার আমার বন্ধু এ্যান। এক সময়ের সহকর্মী। সুইজারল্যান্ড যাব, অথচ এ্যানের সংগে দেখা হবেনা! এযেন দুজনের জন্যই ভাবনার বাইরে। এ্যান ঢাকায় আসলে আমি নানা বাহানা দিতে পারি। যানজট, সন্ধ্যায় বের হওয়া যাবেনা, আজকে না কালকে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমি জুরিখ গেলে এ্যানের জন্য কোন বাহানা নেই। আমাকে আসতেই হবে। দরকারে ও জুরিখ এসে আমাকে নিয়ে যাবে। অতঃপর কাজ শেষে জুরিখ থেকে বার্ন না গিয়ে আর উপায় থাকেনা।
তো সেই ছিমছাম শহরের একটা পরিপাটি এপার্টমেন্টে মধ্যরাত পর্যন্ত রান্না, খাওয়া, গল্প, আড্ডায় কখন ঘুমিয়েছি, মনে পড়েনা। শুধু মনে পড়ে রাতে একবার বৃষ্টি পড়ার শব্দ পেয়েছি। এরপর একটানে সকাল আটটা। দুদ্দাড় উঠে সিদ্ধান্ত নয়টার ট্রেনে রওয়ানা দেব গ্রুয়েনের পথে। যেই ভাবা সেই কাজ।
সাড়ে আটটায় বের হয়ে দেখি, চনমনে দারুন এক সূর্যে উঠেছে আকাশে। সোনা রং রোদে মাখামাখি চারপাশ। রাতের বৃষ্টির দাগ রয়ে গেছে কোথাও কোথাও। বার্ন ইউনিভারসিটির ভেতর দিয়ে বা পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, দুজন। রাস্তায় পড়ে অাছে ঝরে পড়া কাঠ বাদামের বীজ। হঠাৎ শুরু গীর্জার ঘন্টা। ঢং ঢং ঢং। লোক নাই জন নাই। প্রাচীন একটা গীর্জা। আকাশ মুখো তার চূড়া। কোথাও কোন জনমানব নাই। রাস্তায় আমরা দু’জন। আর দেখি গীর্জার চাতালে ধীরে ধীরে হেঁটে উঠছে দু’জন মানুষ। একজন নারী একজন পুরুষ। পরস্পরের হাত ধরে, ধীরে ধীরে, পরম আস্থায়, নির্ভরতায়। দু’জনেই প্রায় আশির কাছাকাছি!
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। বৃষ্টি ভেজা, রোদ মাখা সেই ভীনদেশী ভোরে কেন যেন আচমকাই চোখে ঝাল ঝাল লাগে। হয়তো আরো ত্রিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকি। দেখি, আমার জীবনের একটা সেরা ভোর। গীর্জার ঢং ঢং ঘন্টা ততক্ষণ বেজেই যায়, বেজেই যায়...