09/08/2026
জন্ম দিলেই কি বাবা হওয়া যায়?
আমার ধারণা—না।
শুধু একজন সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসলেই কেউ বাবা হয়ে যায় না। জন্ম দেওয়া জীববিজ্ঞানের বিষয়, কিন্তু বাবা হওয়া একটা দায়িত্ব, একটা ত্যাগ, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের নাম।
লিওনেল মেসির জীবনটা দেখুন।
ছোটবেলা থেকেই মেসি অন্য অনেক শিশুর মতো ছিল না। ফুটবলে তার অসাধারণ প্রতিভা থাকলেও তার সামনে ছিল বড় একটি সমস্যা—তার গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ছিল এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হতো। সেই চিকিৎসার খরচ পরিবারের জন্য সহজ ছিল না।
মেসির বাবা জর্জ মেসি তখন পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি ছেলের চিকিৎসা ও ফুটবল ক্যারিয়ারের পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। মেসির পরিবার ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। তার বাবা কাজ করতেন এবং ছেলের ফুটবল ও চিকিৎসার জন্য পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
পরবর্তীতে বার্সেলোনায় মেসির সুযোগ তৈরি হলে ক্লাব তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে যায়। ভাবুন একবার—একজন বাবা-মায়ের জন্য কতটা কঠিন ছিল এত অল্প বয়সে সন্তানকে অন্য দেশে পাঠানো!
কিন্তু জর্জ মেসি ছেলের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন।
মেসি যখন ছোট, তখন ফুটবল খেলতে গিয়ে সবসময় নতুন জার্সি, বুট কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়াটাও সহজ ছিল না। কিন্তু পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে তার ফুটবল চালিয়ে যাওয়ার জন্য বাবা চেষ্টা করেছেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন—ছেলের এই স্বপ্নটা হয়তো একদিন তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।
তারপর আসে মেসির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি।
২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে আর্জেন্টিনা হেরে যায়।
মেসি পেনাল্টি মিস করেন। প্রচণ্ড হতাশা, সমালোচনা আর পরপর ফাইনালে ব্যর্থতার চাপের মধ্যে তিনি ঘোষণা দেন যে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন।
একজন বাবা চাইলে তখন বলতে পারতেন—
“এত কিছু করেও তো কিছু হলো না।”
কিন্তু একজন বাবা সেটা করেননি।
পরিবার, কাছের মানুষ এবং সমর্থকদের ভালোবাসায় মেসি পরে সিদ্ধান্ত বদলে আবার আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে ফিরে আসেন।
আর সেই ফিরে আসার গল্পের শেষটা আমরা সবাই জানি।
২০২১—কোপা আমেরিকা জয়।
২০২২—বিশ্বকাপ জয়।
যে মানুষটাকে একসময় বলা হয়েছিল বড় ম্যাচে সে পারে না, সেই মানুষটাই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিল।
এখানেই একজন বাবার ভূমিকা বোঝা যায়।
সন্তান যখন জেতে, তখন পাশে দাঁড়ানো খুব সহজ।
সন্তান যখন হেরে যায়, তখনও পাশে থাকা—সেটাই আসল বাবা।
মেসির গল্প শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটা একজন সন্তানের স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাবার গল্পও।
আর আমাদের সমাজের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়।
আমাদের সমাজে এমন অনেক বাবা আছেন, যারা সন্তানকে জন্ম দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন—কিন্তু সন্তানের মনের খবর কখনো নেননি।
সন্তান কী চায়, কী নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে, কোন স্বপ্নটা তার—এসব জানার প্রয়োজন মনে করেন না।
সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে বলেন—
“তুই জীবনে কিছু করতে পারবি না।”
ব্যবসায় ব্যর্থ হলে বলেন—
“তোর দ্বারা কিছু হবে না।”
চাকরি না পেলে বলেন—
“অমুকের ছেলে তো চাকরি করছে, তুই পারিস না কেন?”
সন্তান নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চাইলে তার কথা না শুনে চাপ দেন।
সন্তান নিজের পছন্দের ক্যারিয়ার বেছে নিতে চাইলে বলেন—
“এগুলো করে জীবনে কিছু হবে না।”
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—সন্তান যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখনও অনেক বাবা-মা বুঝতে পারেন না যে তাদের একটি কথাই হয়তো সন্তানের মনে সারাজীবনের ক্ষত তৈরি করছে।
সন্তানকে খাওয়ানো দায়িত্ব।
পড়াশোনা করানো দায়িত্ব।
কাপড়-চোপড় দেওয়া দায়িত্ব।
কিন্তু সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখা—এটাও দায়িত্ব।
সন্তান ভুল করলে তাকে অপমান না করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার।
সন্তান ব্যর্থ হলে তাকে আরও নিচে নামিয়ে না দিয়ে বলতে হয়—
“ব্যর্থ হয়েছিস? সমস্যা নেই। আবার চেষ্টা কর। আমি আছি।”
কারণ সন্তান পৃথিবীর কাছে হাজারবার হেরে গেলেও যদি বাড়িতে ফিরে একজন মানুষকে পায় যে বলবে—“ভয় পাস না, আমি আছি”, তাহলে সেই সন্তান আবার দাঁড়ানোর শক্তি পায়।
অথচ আমাদের সমাজে কিছু বাবা আছেন, যারা সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হওয়ার বদলে সন্তানের সবচেয়ে বড় মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়ান।
বাইরের মানুষের কষ্টের কথা সন্তান ভুলে যেতে পারে।
কিন্তু নিজের বাবার বলা অপমানজনক কথাগুলো অনেক সময় সারাজীবন মনে থাকে।
একজন সন্তান বাবার কাছে সবসময় টাকা চায় না।
সবসময় দামি জিনিসও চায় না।
অনেক সময় সে শুধু চায়—
“বাবা, তুমি আমার কথাটা একটু শোনো।”
“বাবা, আমি ব্যর্থ হলেও তুমি আমার পাশে থেকো।”
“বাবা, সবাই আমাকে ভুল বুঝলেও তুমি আমাকে একটু বুঝো।”
এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই একজন বাবাকে সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বানিয়ে দেয়।
তাই আমি মনে করি—
জন্মদাতা হওয়া আর বাবা হওয়া এক জিনিস নয়।
জন্মদাতা সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন।
কিন্তু বাবা সন্তানকে পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করতে শেখান।
জন্মদাতা সন্তানকে বড় করেন।
কিন্তু বাবা সন্তানের আত্মবিশ্বাস বড় করেন।
জন্মদাতা সন্তানকে জীবন দেন।
কিন্তু একজন সত্যিকারের বাবা সেই জীবনটাকে সুন্দর করে বাঁচার সাহস দেন।
মেসি আজ পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবলার। তার অর্জনের পেছনে তার নিজের পরিশ্রম সবচেয়ে বড় বিষয়। কিন্তু সেই পথচলায় পরিবারের, বিশেষ করে বাবার সমর্থনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রশ্নটা আবার করি—
জন্ম দিলেই কি বাবা হওয়া যায়?
না।
বাবা হতে হলে সন্তানের জন্মের পরও প্রতিদিন তাকে নতুন করে বেছে নিতে হয়—তার পাশে দাঁড়াতে হয়, তার ব্যর্থতা সহ্য করতে হয়, তার স্বপ্নকে সম্মান করতে হয় এবং প্রয়োজনের সময় বলতে হয়—
“তুই পড়ে গেছিস? উঠে দাঁড়া।
আমি আছি।”
❤️ কারণ বাবা শুধু একটা সম্পর্কের নাম নয়—বাবা হলো এমন একজন মানুষ, যার উপস্থিতিতে সন্তান মনে করে, পৃথিবীটা এখনও তার জন্য নিরাপদ।
#বাবা