14/07/2026
উহুদ একটি পাহাড় নয়, ভালোবাসার একটি ইতিহাস
*******************************************
◾হজ ও ওমরাহর সফরে উহুদ পাহাড় জিয়ারায় নিয়ে যাওয়া হয়। অনেকেই এখানে আসে।ছবি তোলে।ভিডিও করে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। শহীদের কবর জিয়ারত করে। তারপর চলে যায়।
এই উহুদ এমন একটি স্থান, যেখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মাদ ﷺ ইসলামের জন্য রক্তাক্ত হয়েছেন।
এখানে তাঁর দাঁত ভেঙেছে। মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এখানে তাঁর প্রিয় চাচা শহীদ হয়েছেন। যেখানে সত্তরজন সাহাবি রক্ত ঢেলে ইসলামের ভবিষ্যৎ রক্ষা করেছেন। উহুদের কাছে গিয়ে ভাবা প্রয়োজন আমরা সেই উহুদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
◾উহুদ আমাদের ভালোবাসে, আমরাও উহুদকে ভালোবাসি। রাসূল ﷺ বলেছেন—
"هذا جبل يحبنا ونحبه"
এটি এমন একটি পাহাড়, যে আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও তাকে ভালোবাসি।
এই পাহাড় প্রিয় রাসূলকে ভালোবাসে?এই পাহাড় দেখেছে রাসূল ﷺ-কে। আবু বকরকে, উমরকে, উসমানকে, হামজাকে, মুসআবকে, সা'দকে, আনাস ইবনে নাযরকে। কল্পনা করুন এই পাহাড়ের সামনে আমি দাঁড়িয়ে। এটা জীবনের এক অনন্য সময়।
◾চলুন ফিরে যাই ১৪০০ বছর পূর্বে।মদিনা তখন উদ্বিগ্ন। বদরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মক্কার কুরাইশ বাহিনী আসছে। তিন হাজার সৈন্য।
দুইশ অশ্বারোহী। অসংখ্য অস্ত্র। মদিনার দিকে এগিয়ে আসছে।
রাসূল ﷺ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা হবে। সকালে সাতশত সাহাবি নিয়ে রাসূল ﷺ বের হলেন। উহুদের পাদদেশে এসে অবস্থান নিলেন।
◾উহুদ—চোখের সামনে উহুদ। এখন চারপাশে তাকান। আপনার সামনে বিশাল উহুদ পাহাড়।
ডানদিকে শহীদদের কবরস্থান। এক পাশে তীরন্দাজদের পাহাড়। চারদিকে মরুভূমির ভূমি।
আজ সবকিছু শান্ত। এখানে অসংখ্য দর্শনার্থী। কেউ দোয়া করছে কেউ ছবি তুলছে। দলবদ্ধভাবে গ্রুপে গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে উহুদের গল্প শুনছে।
আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কল্পনা করুন। চোখ বন্ধ করে চৌদ্দশত বছর পেছনে ফিরে যান। মনে করুন এখানে কোনো বাস নেই। কোনো হোটেল নেই। কোনো রাস্তা নেই।কোনো দোকান নেই। কোনো ক্যামেরা নেই।
সামনে তিন হাজার কুরাইশ সৈন্য। এদিকে সাতশত মুসলমান। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন আল্লাহর রাসূল ﷺ।
উহুদ এখন আর পাহাড় নয়। ইতিহাস এখন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দেখুন সাহাবিরা অস্ত্র হাতে প্রস্তুত। কারো মুখে ভয় নেই। কারো চোখে দুনিয়ার লোভ নেই। সবার চোখ রাসূল ﷺ-এর দিকে। তিনি সারিবদ্ধ করে দিচ্ছেন সৈন্যদের। কার কোথায় দাঁড়াতে হবে বলে দিচ্ছেন।
এটি শুধু একটি যুদ্ধ নয়। এটি ঈমান ও কুফরের সংঘর্ষ। এটি সত্য ও মিথ্যার সংঘর্ষ। এটি তাওহীদ ও শিরকের সংঘর্ষ।
দেখুন রাসূল ﷺ তীরন্দাজদের পাহাড়ে পঞ্চাশজন সাহাবিকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। নেতা আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর رضي الله عنه।
রাসূল ﷺ বারবার নির্দেশ দিচ্ছেন আমাদের বিজয় হলেও তোমরা নেমে আসবে না। আমাদের পরাজয় হলেও তোমরা নেমে আসবে না। পাখি এসে আমাদের দেহ খেয়ে ফেললেও তোমরা এই স্থান ছাড়বে না।
কারণ নবী ﷺ জানেন এই পাহাড় আজ ইসলামের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তারপর যুদ্ধ শুরু হলো। তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ কাঁপছে।
الله أكبر الله أكبر الله أكبر
সাহাবিরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কুরাইশ বাহিনী পিছিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক তাদের পতাকা পড়ে যাচ্ছে। মুসলমানদের তরবারি বিজয়ের সংবাদ লিখছে। মনে হচ্ছে আজ আবার বদরের পুনরাবৃত্তি হবে।
দেখুন কাফেরদের মোকাবেলায় হামজা رضي الله عنه সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। সিংহের মতো আক্রমণ করছেন। একের পর এক শত্রু মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে একাই যেন একটি বাহিনী।শত্রুর হৃদয়ে আতঙ্ক। মুসলমানদের হৃদয়ে সাহস।
দেখুন মুসআব ইবনে উমাইর رضي الله عنه পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। যে যুবক একদিন মক্কার সবচেয়ে বিলাসী মানুষ ছিলেন। আজ তাঁর হাতে ইসলামের পতাকা।
দেখুন শত্রুরা পালাতে শুরু করেছে। অস্ত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মাঠে গনীমতের মাল দেখা যাচ্ছে।
অনেকের মনে হচ্ছে যুদ্ধ শেষ। বিজয় নিশ্চিত।
আর এখানেই শুরু হলো উহুদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দেখুন তীরন্দাজদের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু সাহাবি নিচের দিকে তাকাচ্ছেন। তারা বলছেন যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে। এখন নেমে না গেলে গনীমতের অংশ পাব না।
তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর رضي الله عنه বারবার বলছেন রাসূল ﷺ-এর আদেশ ভুলে যেও না।
কিন্তু অধিকাংশ নেমে যেতে শুরু করলেন। পাহাড় প্রায় খালি হয়ে গেল।
দেখুন দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছেন একজন দক্ষ অশ্বারোহী সেনাপতি। নাম খালিদ ইবনে ওয়ালিদ।
তখনও তিনি মুসলিম হননি। তার চোখে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
তিনি বুঝে গেলেন পাহাড় খালি। পেছনের রাস্তা উন্মুক্ত। এটাই সুযোগ। হঠাৎ পেছন দিক থেকে আক্রমণ। এক মুহূর্তে যুদ্ধের চিত্র বদলে গেল।
যারা বিজয়ের আনন্দ দেখছিল তারা এখন চারদিক থেকে আক্রান্ত। সামনে শত্রু। পেছনে শত্রু। চারদিকে বিভ্রান্তি। দেখুন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছে মুহাম্মাদ ﷺ শহীদ হয়ে গেছেন।
কিছু সাহাবি স্তব্ধ। কিছু সাহাবি বসে পড়েছেন। মনে হচ্ছে পৃথিবী থেমে গেছে। কিন্তু দেখুন আরেকদল সাহাবি বলছেন যদি মুহাম্মাদ ﷺ শহীদও হয়ে যান, তবে তিনি যে দ্বীনের জন্য লড়েছেন, সেই দ্বীনের জন্য তোমরাও লড়ো। তারা আবার ঝাঁপিয়ে পড়ছেন।
তারা জানেন নবীকে ভালোবাসার প্রমাণ মুখে নয়।প্রমাণ হলো ত্যাগ। যুদ্ধের ময়দানে রাসূল ﷺ তখন শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু। তাঁর চারপাশে অল্প কয়েকজন সাহাবি। তাঁদের দেহ ঢাল হয়ে গেছে।
তীর আসছে। পাথর আসছে। তলোয়ার আসছে। কিন্তু তারা সরে দাঁড়াচ্ছেন না। দেখুন একটি পাথর এসে নবী ﷺ-এর মুখে আঘাত করল। দাঁত মোবারক ভেঙে গেল। মুখমণ্ডল রক্তাক্ত। হেলমেটের লোহার কড়া গালে ঢুকে গেল। রক্ত ঝরছে।
যে মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে সাহাবিরা শান্তি পেতেন।আজ সেই মুখ রক্তে ভিজে গেছে। ওদের ময়দানে দাঁড়িয়ে ১৪ শত বছর আগের সেই দৃশ্য কল্পনা করুন আপনি সেই দৃশ্য দেখছেন। আপনার নবী রক্তাক্ত।
আপনার নবী আহত। আপনার নবী পড়ে যাচ্ছেন।তখন আপনার হৃদয়ের অবস্থা কেমন হতো?
সাহাবিরা কাঁদছিলেন। জীবন দিয়ে তাঁকে রক্ষা করছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন এ মানুষটি শুধু তাদের নেতা নন। এ মানুষটি আল্লাহর রাসূল।
ওহুদের যুদ্ধের কথা স্মরণ করুন। দেখুন উম্মে আম্মারা رضي الله عنها তরবারি হাতে লড়ছেন।
তিনি নারী। কিন্তু নবী ﷺ-কে রক্ষা করতে নিজের শরীরে অসংখ্য আঘাত নিচ্ছেন। আজও উহুদের মাটি তাঁর সাহসের সাক্ষী।
দেখুন হযরত তালহা رضي الله عنه নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। নবী ﷺ-কে রক্ষা করতে করতে তাঁর হাত অচল হয়ে গেছে। আবু দুজানা رضي الله عنه নিজের পিঠ নবীর সামনে ঢাল বানিয়ে দিয়েছেন। তীর এসে তাঁর পিঠে বিঁধছে। কিন্তু তিনি নড়ছেন না।
তারপর দেখুন যুদ্ধ শেষ। শব্দ থেমে গেছে। কিন্তু মাটিতে পড়ে আছেন সত্তরজন শহীদ। উহুদের বুক রক্তে লাল। আকাশ নীরব। পাহাড় নীরব। মদিনা নীরব।
আজ আপনি যখন উহুদের সামনে দাঁড়ান এই দৃশ্যগুলো কল্পনা করুন। এই মাটি শুধু মাটি নয়। এই পাহাড় শুধু পাহাড় নয়। এই বাতাস শুধু বাতাস নয়।এখানে সাহাবিদের রক্তের স্মৃতি আছে। এখানে নবীর চোখের পানির স্মৃতি আছে।
এখানে হামজার শাহাদাতের স্মৃতি আছে। এখানে আনুগত্যের শিক্ষা আছে। এখানে ত্যাগের শিক্ষা আছে।এখানে ভালোবাসার শিক্ষা আছে।এখানে এমন একটি ইতিহাস আছে, যা শুধু পড়ার জন্য নয় অনুভব করার জন্য।
◾উহুদ প্রিয় নবীর ভালোবাসা অনুভব করার একটি ময়দান। উহুদ আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়।
বড় বিপর্যয় সব সময় বড় অপরাধ থেকে আসে না।
অনেক সময় ছোট অবাধ্যতাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে যায়।
পঞ্চাশজন তীরন্দাজের একটি ভুল পুরো যুদ্ধের চিত্র বদলে দিয়েছিল। পুরো উম্মতকে কাঁদিয়েছে। আজও কাঁদাচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে? যে মানুষটি নিজের জন্য নয়, উম্মতের জন্য বেঁচেছেন আজ সেই মানুষটিই রক্তাক্ত।
◾উহুদের ময়দানে দাঁড়িয়ে একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবুন। এই বিপর্যয়ের পেছনে কারা ছিল?
কিছু সাহাবি নবীর নির্দেশ পালন করতে পারেননি।কিন্তু যুদ্ধের পরে রাসূল ﷺ তাদের সঙ্গে কী আচরণ করলেন? তাদের অপমান করেননি। তাদের দূরে সরিয়ে দেননি।তাদের নাম প্রকাশ করে অভিযুক্ত করেননি। বরং আগের মতোই কাছে টেনে নিয়েছেন।
তাদের সঙ্গে বসেছেন। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।
তাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।
তখন আল্লাহ তাআলা নবীর এই হৃদয়ের প্রশংসা করে বললেন—
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ
"আল্লাহর বিশেষ রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।"
وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
আপনি যদি কঠোর ও রূঢ় হৃদয়ের হতেন, তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।(সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
উহুদের ময়দানে দাঁড়িয়ে এই আয়াতের অর্থ অনুভব করা যায়।এখানে নবীর আহত শরীর দেখা যায়। আর তাঁর চেয়েও বড় আহত হৃদয়ের মধ্যেও উম্মতের জন্য ভালোবাসা দেখা যায়।
◾আরও একটি দৃশ্য মনে করুন। হযরত হামজা رضي الله عنه।
প্রিয় চাচা। তাঁকে সবচেয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে। দেহ বিকৃত করা হয়েছে। হৃদয় বিদীর্ণ করা হয়েছে। মক্কা বিজয়ের পরে সেই হত্যাকারী ওহশী ইসলাম গ্রহণ করে নবীর সামনে এসে দাঁড়াল।
রাসূল ﷺ তাকে মুসলমান হিসেবে গ্রহণ করলেন।
ক্ষমা করলেন। উম্মতের অংশ বানালেন। শুধু বললেন যতটা সম্ভব আমার সামনে কম এসো। তোমাকে দেখলে আমার চাচার কথা মনে পড়ে।
কী অসাধারণ ভালোবাসা! কী অসাধারণ ক্ষমা!
কী অসাধারণ হৃদয়---
◾উহুদে দাঁড়িয়ে শুধু যুদ্ধ দেখবেন না। শুধু শহীদদের কবর দেখবেন না। শুধু ইতিহাস দেখবেন না। নবীর হৃদয়কে দেখার চেষ্টা করুন। রক্তাক্ত অবস্থায়ও উম্মতের জন্য ভালোবাসা। কষ্টের মাঝেও ক্ষমা।আঘাতের মাঝেও দয়া। ব্যথার মাঝেও রহমত।
তখন বুঝতে পারবেন উহুদ শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়।
উহুদ হলো নবীর ভালোবাসা দেখার একটি ময়দান।
নবীর দয়া দেখার একটি ময়দান। নবীর ক্ষমা দেখার একটি ময়দান।আর উহুদের মাটিতে দাঁড়িয়ে যে হৃদয় এই ভালোবাসা অনুভব করতে পারে, সে আর আগের মানুষ হয়ে ফিরে যায় না।
◾উহুদের কবরস্থান মোহাব্বাতের সাথে যিয়ারাহ করুন। এখানেই শুয়ে আছে শোহাদায়ে উহুদ। আজ আমরা যে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি, এখানে এমন মানুষ ঘুমিয়ে আছেন, যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন তোমরা আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত।
১. এখানে শুয়ে আছেন হযরত হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব رضي الله عنه আল্লাহর সিংহ, রাসূলের সিংহ। উহুদের কবরস্থানে সবচেয়ে আবেগের নাম হামজা।
তিনি শুধু চাচা ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ-এর দুধভাই। শৈশবের সঙ্গী। সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষক।
যখন মক্কায় কেউ রাসূল ﷺ-এর পাশে দাঁড়াতে সাহস করত না, তখন হামজা দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশের শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়।
বদরের দিন তিনি ছিলেন ইসলামের বজ্র। উহুদের দিনও তিনি শত্রুদের মধ্যে ঝড় তুলেছিলেন।সিরাতকাররা বলেন, তিনি একাই বহু মুশরিককে হত্যা করেছিলেন। তখন দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ওহশী।
হিন্দ বিনতে উতবার প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল।
ওহশীর হাতে ছিল একটি বর্শা। একটি মাত্র আঘাত।হামজা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ইসলামের সিংহ চলে গেলেন। যখন নবী ﷺ তাঁর দেহ দেখলেন, তিনি গভীরভাবে কষ্ট পেলেন।
এ দৃশ্য তাঁর হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। উহুদের কবরস্থানে দাঁড়িয়ে যদি কোনো কবরের সামনে বেশি সময় দাঁড়াতে হয়, তবে সেটি হামজার কবর। এই হামজার শাহাদাতে প্রিয় নবী শব্দ করে কেঁদেছিলেন। কারণ দ্বীন প্রচারে সবচেয়ে কঠিন সময় হযরত হামজার শক্তিশালী ভূমিকা ছিল।
২. মুসআব ইবনে উমাইর رضي الله عنه। বিলাসিতা থেকে শাহাদাত। মক্কার সবচেয়ে ধনী ও অভিজাত যুবকদের একজন ছিলেন মুসআব। তাঁর পোশাক, সুগন্ধি ও জীবনযাপন ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সব হারালেন। মা ত্যাগ করলেন। পরিবার ত্যাগ করল। সম্পদ চলে গেল। তবুও তিনি ইসলাম ছাড়লেন না।
মদিনায় ইসলামের প্রথম শিক্ষক হিসেবে তাঁকেই পাঠানো হয়েছিল। অনেক আনসার তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি ইসলামের পতাকা বহন করছিলেন। শত্রুরা জানত, পতাকা পড়ে গেলে মনোবল ভেঙে যায়। তাই তারা বারবার তাঁকে লক্ষ্য করল।
এক হাত কেটে গেল। তিনি অন্য হাতে পতাকা ধরলেন। দ্বিতীয় হাতও কেটে গেল। তিনি বুকে চেপে পতাকা ধরে রাখলেন। অবশেষে শহীদ হলেন।শাহাদাতের পর তাঁর কাফনের জন্য পুরো কাপড়ও ছিল না। মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত। পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। রাসূল ﷺ তাঁকে দেখে কেঁদেছিলেন।
৩. আনাস ইবনে নাযর رضي الله عنه।। বদরের যুদ্ধে অংশ নিতে না পারার কারণে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আল্লাহ যদি আরেকটি সুযোগ দেন, আমি দেখিয়ে দেব কী করতে পারি।
উহুদের দিন যখন মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো, অনেকেই পিছিয়ে গেলেন। কিন্তু আনাস বললেন আমি তো জান্নাতের সুবাস উহুদের দিক থেকে পাচ্ছি।
তারপর তিনি একাই শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
শাহাদাতের পর তাঁর দেহে আশিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। নিজের বোন ছাড়া কেউ তাঁকে চিনতে পারেনি।
৪. হানযালা ইবনে আবি আমির رضي الله عنه। যাকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছিলেন। তিনি সদ্য বিবাহ করেছিলেন। বিবাহের রাতের পর সকালেই যুদ্ধের ডাক আসে। তিনি গোসল করার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যান। শাহাদাত লাভ করেন।
পরে রাসূল ﷺ বলেন আমি দেখেছি ফেরেশতারা তাঁকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে গোসল দিচ্ছে।
এ কারণেই তাঁর উপাধি হয় গাসীলুল মালাইকাহ
(ফেরেশতাদের দ্বারা গোসলপ্রাপ্ত ব্যক্তি)
৫. আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ رضي الله عنه এর শাহাদাতের জন্য দোয়া। যুদ্ধের আগে তিনি দোয়া করেছিলেন হে আল্লাহ! আগামীকাল এমন একজন শত্রুর মুখোমুখি করো, যে আমাকে হত্যা করবে, আমার নাক-কান কেটে ফেলবে। তারপর তুমি জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব এগুলো তোমার ও তোমার রাসূলের জন্য দিয়েছি। অবিশ্বাস্যভাবে তাঁর সঙ্গে ঠিক তাই ঘটেছিল। তাঁর দোয়া কবুল হয়েছিল।
৬. সা'দ ইবনে রাবী رضي الله عنه। শেষ নিঃশ্বাসেও উম্মতের চিন্তা। যুদ্ধের শেষে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া গেল। রাসূল ﷺ তাঁর খোঁজ করছিলেন। সাহাবিরা তাঁকে প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় পেলেন। তিনি বললেন আমার পক্ষ থেকে রাসূল ﷺ-কে সালাম দিও। তারপর আনসারদের উদ্দেশে বললেন যতক্ষণ তোমাদের একজন জীবিত থাকবে, রাসূল ﷺ-এর কোনো ক্ষতি হলে আল্লাহর কাছে তোমাদের কোনো অজুহাত থাকবে না। এ কথা বলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
৭. আমর ইবনুল জামূহ رضي الله عنه তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম ছিলেন। তাঁর ওপর জিহাদ ফরজ ছিল না। ছেলেরা তাঁকে যেতে দিতে চাইছিল না।
কিন্তু তিনি বললেন। আমি এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে হাঁটতে চাই।
উহুদের দিন তিনি শহীদ হলেন। রাসূল ﷺ পরে বলেছিলেন আমি তাঁকে জান্নাতে সুস্থ পায়ে হাঁটতে দেখেছি।
উহুদের শহীদদের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষা
এই কবরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি হামজা শেখান সাহস। মুসআব শেখান ত্যাগ। আনাস শেখান জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা। হানযালা শেখান আল্লাহর ডাকে সাড়া। আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ শেখান আন্তরিকতা।সা'দ শেখান নবীপ্রেম।
আমর ইবনুল জামূহ শেখান অজুহাত নয়, আত্মত্যাগ।
তাই উহুদের কবরস্থানে দাঁড়িয়ে শুধু সালাম দিয়ে চলে যাওয়া যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন করতে হবে আমি কি এমন কোনো কাজ করছি, যার জন্য কিয়ামতের দিন এই শহীদদের পাশে দাঁড়াতে পারব? উহুদ শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়।
উহুদ হলো ঈমান, আনুগত্য, ত্যাগ, ভালোবাসা এবং শাহাদাতের জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
◾রাসূল ﷺ নিয়মিত উহুদের শহীদদের জিয়ারত করতেন। জীবনের শেষ দিকেও এসেছেন। দোয়া করেছেন। সালাম দিয়েছেন। কেঁদেছেন। কারণ এরা ইসলামের জন্য সব দিয়েছেন। যারা সব দেয় তাদেরকে ভুলে যাওয়া যায় না। আমরা আজ উহুদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কী অনুভব করব? এখান থেকে কি নিয়ে যাবো। শুধু কিছু ছবি আর কিছু ভিডিওর স্মৃতি?
তাহলে এটা ভুল হবে।
এখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন আমি ইসলামের জন্য কী দিয়েছি? আমার নামাজ কেমন? আমার কুরআন কেমন? আমার দাওয়াত কেমন? ইসলামের প্রতি আমার ভালবাসা কেমন? আমার ত্যাগ কোথায়?
◾উহুদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
উহুদ বলে আদেশ মানো।
উহুদ বলে গনীমতের লোভে আদর্শ বিক্রি করো না।
উহুদ বলে ভুল করলে তওবা করো।
উহুদ বলে পরাজয়ও শিক্ষা।
উহুদ বলে শহীদরা মরে না।
উহুদ বলে রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসো।
উহুদ বলে আল্লাহর জন্য জীবন দাও।
যখন উহুদ থেকে ফিরে যাবেন একবার পাহাড়টির দিকে তাকান। মনে মনে বলুন হে উহুদ!তুমি নবীকে দেখেছ। তুমি হামজাকে দেখেছ। তুমি সাহাবিদের রক্ত দেখেছ। তুমি ইসলামের ইতিহাস দেখেছ। তুমি আমাদের ভালোবাসো। আমরাও তোমাকে ভালোবাসি।
আর হে আল্লাহ! উহুদের শহীদদের মতো ঈমান দাও।
হামজার মতো সাহস দাও। রাসূল ﷺ-এর মতো ক্ষমা করার হৃদয় দাও।এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে উহুদের শহীদদের সাথেই উঠিয়ে নিও।
M***i Saeed Ahmad
মুদাররিস, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া
প্রিন্সিপাল মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত