01/03/2026
মসজিদে নববী সম্পর্কে কম-জানা প্রামাণ্য তথ্য
মদিনার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদে নববী ইসলামিক ইতিহাসের স্পন্দন, হিজরতের স্মৃতি, ভালোবাসার কেন্দ্র। এখানে এসে মানুষ নামাজ পড়ে, রাসুলুল্লাহ ﷺ–কে সালাম জানায়, দরুদ পড়ে, কাঁদে এবং নিজের ভেতরটাকে নতুন করে খুঁজে পায়।
ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম এই মসজিদকে আমরা যতটা জানি, তার চেয়েও অনেক গভীর তার গল্প। চলুন, আবেগ ও তথ্য দুটো একসঙ্গে নিয়ে একটু ভেতরে যাই।
১. উটনী কাসওয়ার থামা, একটি মসজিদের সূচনা
হিজরতের পর মদিনাবাসীরা রাসুলুল্লাহ ﷺ–কে নিজেদের ঘরে আতিথ্য দেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন, “ওকে ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর নির্দেশে চলছে।”
উটনী কাসওয়া গিয়ে থামে দুই ইয়াতিম বালক; সুহাইল ও সাহলের জমিতে। তারা জমি উপহার দিতে চাইলেও নবী ﷺ তা মূল্য দিয়ে ক্রয় করেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, সেখানে খেজুর গাছ ও কিছু পুরোনো কবর ছিল; সেগুলো সরিয়ে নির্মাণ শুরু হয়। নবী ﷺ নিজ হাতে ইট বহন করতেন এবং বলতেন,
“আসল জীবন তো আখিরাতের জীবন; হে আল্লাহ, আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করুন।”
এই মসজিদের ভিত্তি মাটি, তাকওয়া ও ত্যাগ।
২. প্রথম ইমাম ছিলেন স্বয়ং নবী ﷺ
মসজিদে নববীর প্রথম ইমাম ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে। এখানেই রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ আদায় করাতেন, খুতবা দিতেন, সাহাবাদের শিক্ষা দিতেন। এটি ছিল ইবাদতের স্থান, আবার রাষ্ট্রীয় পরামর্শ ও বিচারকার্যের কেন্দ্রও।
৩. একটি নামাজ হয় হাজার নামাজের সমান
সহিহ সহীহ বুখারিতে এসেছে,
“আমার এই মসজিদে এক নামাজ অন্য যে কোনো মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম মসজিদুল হারাম ছাড়া।”
এই কারণেই মুসলমানেরা দূর দেশ থেকে ছুটে আসেন, একবার এখানে সিজদাহ দেওয়ার জন্য।
৪. তিনটি মসজিদ এ বিশেষ সফরের অনুমতি
রাসুল ﷺ বলেছেন, বিশেষ সওয়াবের উদ্দেশ্যে সফর করা যায় কেবল তিনটি মসজিদে:
মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা এবং আমার এই মসজিদ।
এটি মসজিদে নববীর মর্যাদাকে স্পষ্ট করে দেয়।
৫. সবুজ গম্বুজ সবসময় সবুজ ছিল না
আজ যে সবুজ গম্বুজ মদিনার প্রতীক, তা প্রথমে কাঠের ছিল এবং রংহীন। সময়ের সাথে সেটি কখনও সাদা, কখনও নীল, কখনও বেগুনি রঙে রঞ্জিত হয়েছে। উসমানি শাসনামলে ফাটল ঢাকার উদ্দেশ্যে সবুজ রঙ করা হয়। ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে “গুম্বদে খিজরা” - সবুজ গম্বুজ।
সবুজ রঙ ইসলামে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআনে জান্নাতবাসীদের পোশাক সবুজ বলে উল্লেখ আছে। বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, সবুজ ছিল নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর প্রিয় রঙের একটি। বিভিন্ন সূত্রে এসেছে মুহাম্মদ ﷺ সবুজ পাগড়ি ও সবুজ চাদর পরিধান করতেন। তাই সবুজ গম্বুজ কেবল একটি রঙ নয়; এটি ভালোবাসা, সুন্নাহ এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
৬. রূপোলি গম্বুজের ইতিহাস
সবুজ গম্বুজের পাশে আপনি একটি রূপোলি (সিলভার) গম্বুজ লক্ষ্য করতে পারেন। কিন্তু জানেন কি, প্রায় ৬০০ বছর ধরে এখানে কোনো গম্বুজ ছিল না! ১৬শ শতকে মমলুক সুলতান কাঠ দিয়ে প্রথম গম্বুজ তৈরি করেন।
১৯১৬ সালে সৌদি রাজা আবদুলআজিজ আল সউদের আমলে মসজিদে নববী ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে গম্বুজটি রূপোলি রঙে রঙিন করা হয়। পরে কিং ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের আমলে এটি ২৪-কোরাট গোল্ড প্লেটেড স্টেইনলেস স্টীল দিয়ে পুনঃনির্মাণ করা হয়। রূপোলি গম্বুজটির ব্যাস ২৬ মিটার এবং ওজন প্রায় ১৬০ টন।
২০০৭ সালে সৌদি মিউনিসিপ্যালিটি সবুজ গম্বুজ রূপোলি করার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা প্রতিবাদে সোচ্চার হন। ফলে সবুজ গম্বুজ পুনরায় সবুজ রঙে রঙ করা হয় এবং তা আজও রক্ষিত আছে।
৭. আয়তনে প্রাচীন ইয়াসরিবের(মদিনা) চেয়েও বড়
বর্তমান মসজিদে নববীর আয়তন প্রায় ৮২,০০০ বর্গমিটার। একসাথে প্রায় ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এর বিস্তৃতি প্রাচীন ইয়াসরিব নগরীর আয়তনের চেয়েও বড়।
৮. ছয়টি মিহরাব
অনেকে একটি মিহরাবই লক্ষ্য করেন। কিন্তু বাস্তবে এখানে ছয়টি মিহরাব রয়েছে। যে মিহরাবটি বর্তমানে ইমাম ব্যবহার করেন, সেটিই সেই স্থান যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে নামাজে ইমামতি করতেন। এই মিহরাবকে বলা হয় “মিহরাবে নববী” এবং “মিহরাবে হানাফি”।
এ ছাড়া রয়েছে মিহরাবে তাহাজ্জুদ, মিহরাবে বাইতুল মুকাদ্দাস, মিহরাবে উসমানি, মিহরাবে সুলাইমানি এবং মিহরাবে ফাতিমা। প্রতিটি মিহরাব একেকটি যুগের স্মারক।
৯. প্রথম মুয়াজ্জিন - বিলাল (রা.)
আজানের সূচনা হয়েছিল এক স্বপ্নের মাধ্যমে। আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে আজানের বাক্য শুনে নবী ﷺ–কে জানান। তখন উমর (রা.) এসে বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমিও একই স্বপ্ন দেখেছি।”
এই বাক্যগুলোকে আজান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নবী ﷺ বলেন, “বিলালকে শেখাও; তার কণ্ঠ উচ্চ।”
এভাবেই বিলাল ইবনে রবাহ (রা.) হয়ে ওঠেন প্রথম মুয়াজ্জিন। আজও সেই একই শব্দে মুসলমানদের ডাকা হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে; ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশা।
১০. রওদাহ—এক টুকরো জান্নাত
রাসুল ﷺ বলেছেন,
“আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের স্থান জান্নাতের এক টুকরো।”
রওদাহ মুবারাক সেই পবিত্র স্থান, যেখানে সমাহিত আছেন নবী মুহাম্মদ ﷺ, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)।
১১. খালি কবর—ঈসা (আ.)-এর জন্য
রওদাহ মুবারাকের পবিত্র স্থানে নবী ﷺ, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)–এর কবর রয়েছে। তবে সেখানে একটি চতুর্থ কবরের স্থান খালি রাখা হয়েছে।
বিশ্বাস করা হয়, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা (আ.) পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁকে নবী ﷺ–এর পাশে দাফন করা হবে। সেই নীরব স্থান ভবিষ্যতের এক প্রতিশ্রুতির স্মারক।
১২. আরব উপদ্বীপে প্রথম বিদ্যুৎপ্রাপ্ত স্থান
উসমানি সুলতান আবদুল হামিদ দ্বিতীয়ের আমলে, ১৯০৯ সালে মসজিদে নববী আরব উপদ্বীপে প্রথম বিদ্যুৎপ্রাপ্ত স্থানে পরিণত হয়। আজ এখানে হাজার হাজার বাতি ও আধুনিক শব্দব্যবস্থা রয়েছে যাতে আজানের ধ্বনি বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
মসজিদে নববী শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি ভালোবাসার কেন্দ্র। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বোঝে রাসুল ﷺ–কে ভালোবাসা মানে তাঁর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা।
মদিনায় সফর শেষে মানুষ ফিরে আসে হৃদয়ে প্রশান্তি এবং এক গভীর অনুভূতি নিয়ে। এটি সেই সৌভাগ্য, যা এই উম্মাহর অংশ হওয়ার উপলব্ধি দেয়।