12/10/2026
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU) প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আসলে কোনো সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গল্প নয়; এটি ছিল বঙ্গভঙ্গ বাতিলের পর পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ দূর করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া একটি "রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ"।
এই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছিল:
১. বঙ্গভঙ্গ রদ এবং পূর্ব বাংলার হতাশা
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে যে নতুন আশার আলো দেখেছিল, ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ঘোষণার মাধ্যমে তা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পূর্ব বাংলার মানুষ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ে, কারণ তারা আবার কলকাতার অধীনে অবহেলিত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছিল।
২. নবাব সলিমুল্লাহর ঐতিহাসিক উদ্যোগ
পূর্ব বাংলার মানুষের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ আঁচ করতে পেরে ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। এই সুযোগে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ভাইসরয়ের সাথে দেখা করেন।
নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দেখান যে, বঙ্গভঙ্গ বাতিলের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষের সাথে চরম অবিচার করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। লর্ড হার্ডিঞ্জ তাদের দাবিতে সম্মত হন এবং ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
৩. প্রবল বিরোধিতা (নাথান কমিটি গঠন)
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই ঘোষণার পর কলকাতার কিছু বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয়তাবাদী নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, পূর্ব বাংলার মানুষ কৃষিপ্রধান এবং অনগ্রসর, তাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করা মানে অর্থের অপচয়।
তবে সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ব্রিটিশ সরকার ১৯১২ সালেই ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে 'নাথান কমিটি' গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু করে।
৪. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ পুরোপুরি থমকে যায়। তাছাড়া ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যু এই আন্দোলনকে বড় ধাক্কা দেয়।
যুদ্ধ শেষে ১৯১৭ সালে 'স্যাডলার কমিশন' বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ঢাকার প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়ন করে এবং অনুকূল রিপোর্ট দেয়। অবশেষে ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট’ পাস হয়।
১ জুলাই, ১৯২১: নতুন দিগন্তের সূচনা
অবশেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই মাত্র ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৭৭ জন ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। (শুরুতে কোনো ছাত্রী ছিল না, পরে ১৯২২ সালে প্রথম ছাত্রী ভর্তি হন লীলা নাগ)। ঢাকার নবাব পরিবার তাদের বিপুল পরিমাণ জমি এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলেই পূর্ব বাংলায় একটি সুশিক্ষিত ও সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের
মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মূল নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাই একে বলা হয় "বাংলাদেশের জন্মদাত্রী"।