31/08/2026
৩ মাসের নিষেধাজ্ঞায় প্রাণ ফেরে সুন্দরবনে
বন্য প্রাণীর বিচরণ বেড়েছে, কমেছে বন অপরাধ
মামুন আহমেদ, বাগেরহাট
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৩৯
৩ মাসের নিষেধাজ্ঞায় প্রাণ ফেরে সুন্দরবনে
সুন্দরবন। ছবি : সংগৃহীত
তিন মাস পর্যটকহীন ছিল সুন্দরবন। ছিল না জেলে-বাওয়ালির কোলাহল কিংবা নৌযানের বাড়তি শব্দ।
মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এই বন।
নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে বনের চরে নির্ভয়ে ঘাস খেয়েছে হরিণের পাল, খালপাড়ে রোদ পোহাতে দেখা গেছে কুমিরকে। গাছের ডালে ডালে পাখির কলকাকলি আর বনের গহিনে বাঘের বিচরণে ফিরে আসে সুন্দরবনের নিজস্ব ছন্দ।
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও উন্মুক্ত হচ্ছে সুন্দরবন।
মাছ ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি, বিচরণ ও প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ, মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ ও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। চলতি বছরও এই নিষেধাজ্ঞার সময় বনজসম্পদের ওপর মানুষের চাপ কম থাকে। ফলে প্রাণ-প্রকৃতি আরো সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ আসে। পাশাপাশি কমে সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে সুন্দরবনে বনরক্ষীরা ৬৩টি অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে বন অপরাধের ঘটনায় ৩৯টি মামলা করা হয়, আটক করা হয় ৩৭ জনকে। এ সময় ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি মাছ ধরার জাল, ২৮ বোতল ও দুই লিটার তরল বিষ এবং ছয় হাজার ২৯০টি হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া ১৮৬ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া, এক হাজার ৫৬২টি চারু, দুই হাজার বড়শি, ১৭০ কেজি মধু এবং দুই বস্তায় থাকা পাঁচ কেজি শুঁটকি মাছ উদ্ধার করা হয়।
বনবিভাগ বলছে, গত বছর নিষেধাজ্ঞা থাকা সময়ের তুলনায় চলতি বছরের একই সময় বন অপরাধের পরিমাণ কমেছে।
বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনের নদী-খালে মাছের পরিমাণ বেড়েছে। বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কৃত্রিম শব্দদূষণ, অতিরিক্ত পর্যটন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ কমে যাওয়ায় বনের গহিন অঞ্চলে উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরো বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় বনবিভাগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও প্রযুক্তিনির্ভর। দুর্গম বনাঞ্চলে নিয়মিত বিশেষ অভিযান ও স্মার্ট প্যাট্রলিং জোরদারের পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে আকাশপথেও নিবিড় নজরদারি করা হচ্ছে। ফলে হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী অসাধু চক্রের তৎপরতা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে।
এ ছাড়া তিন মাস মানুষের প্রবেশ সীমিত থাকায় বনের গহীন অঞ্চলে ফিরেছিল স্বস্তির পরিবেশ। হরিণের দল মানুষের ভয় ছাড়াই চরে ঘুরে বেড়িয়েছে, বনের খালে কুমির পেয়েছে নির্বিঘ্ন বিচরণের সুযোগ। পাখিরা নিশ্চিন্তে বাসা বেঁধেছে গাছের ডালে। প্রজনন মৌসুমে বন্যপ্রাণীরা পেয়েছে তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ। ফলে নিষেধাজ্ঞার এই সময়টিকে সুন্দরবনের জন্য এক ধরনের ‘বিশ্রামের সময়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন শুধু বাঘ-হরিণের আবাসস্থল নয়; এটি একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ, উভচর ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের নীরবতা বা নিস্তব্ধতা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট চাপ কম থাকায় বনের ইকোসিস্টেম নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করতে শুরু করে। বিশেষ করে বাঘ ও হরিণসহ বন্যপ্রাণীর প্রজননের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত কার্যকর। নিষেধাজ্ঞার এই সময় সুন্দরবনের ভেতরের কেওড়া, সুন্দরী ও বাইনগাছের চারাগুলো বাধা ছাড়াই দ্রুত বেড়ে উঠছে। এতে ধীরে ধীরে বনের ঘনত্ব বাড়ছে এবং প্রাণীদের আবাসস্থলও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
এদিকে, নিষেধাজ্ঞার তিন মাস শেষ হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে ফিরবেন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটক। এরইমধ্যে বনবিভাগও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বৈধভাবে জেলে-বাওয়ালিদের পাস-পারমিট দেওয়া, নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বনজীবীদের প্রবেশ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় নজরদারি জোরদার করেছে বনবিভাগ।
উল্লেখ্য, ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের (আইআরএমপি) সুপারিশ অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ রাখা হতো। পরে ২০২২ সালে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট করা হয়। এ সময় কর্মহীন জেলেদের মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়।