20/08/2022
সিলেট টু ঢাকা টু কুয়াকাটা ভ্রমন রিভিউ বিস্তারিত।
কুয়াকাটা ভ্রমণ ও আমার প্রথম লঞ্চে উঠা।
সিলেট-ঢাকা(বাস)-আমতলী(লঞ্চ)-কুয়াকাটা(অটো)-পদ্মাসেতু-সিলেট। ১২ তারিখ সকালে যাত্রা শুরু করেছি। ১৬ তারিখ ভোরে সিলেট এসেছি।
এই ব্লগে আমি মূলত আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছি৷ যাদের তথ্য দরকার তারা সরাসরি নিচে চলে যান।
জুলাই মাসে আমার মেঘালয় ভ্রমণ করার কথা ছিলো। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। সেমিষ্টার ফাইনাল শেষে একটা ট্যুর দেওয়া রীতিমতো বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।বান্দরবান যাবো নাকি টাঙ্গুয়া যাবো সিদ্ধান্ত নিতে নিতে চলে গেলাম কুয়াকাটা। এই প্রথম দক্ষিনবঙ্গে যাবো তাই অবশ্যই লঞ্চে যাওয়া চাই। প্রথমথেকেই মনস্থির করেছিলাম গেলে অবশ্যই লঞ্চে যাবো। তাই পরিকল্পনা অনু্যায়ী ১২ তারিখ সকালের গাড়িতে চলে গেলাম সিলেট থেকে ঢাকা।ট্যুরমেট ছিলো Hino Ak1j সিরিজের ইউনিক নন-এসি বাস। নন-এসিতে ইউনিক আমার কাছে সবসময়ই সেরা লাগে। যদিও এই বাসটিতে দুইসিটের মাঝে হাতল আর নিচে পা রাখার জায়গাটা ছিলো না।যাই হোক,দুপুড় ২ টাই ঢাকা পৌঁছাই। সায়েদাবাদ নামবো নাকি যাত্রাবাড়ি মোড়ে নামবো এই সিদ্ধান্ত নিতে নিতে সুপারভাইজার সাহেব বললো আপনারা এখানে নামেন। এখান থেকে সদর ঘাট একদমই কাছে। আমরাও সরল মনে নেমে গেলাম। যেহেতু আমার ঢাকায় তেমন আসা-যাওয়া করা হয় না তাই রোড ম্যাপ নিয়ে তেমন একটা ধারণা নেই। গুগল ম্যাপই একমাত্র ভরসা তাই গুগল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আমার লোকেশন থেকে সদরঘাট কতদূর?
এই ভর দুপুড়ে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে গুগল যা দেখালো আমি সত্যিই এটা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার লোকেশন থেকে সদরঘাট ৬ কিলোমিটার দূরে। দেখেই তো মাথায় হাত।তারপর বুঝলাম এত সরল মন নিয়ে চললে হবে না। জীবনে চলতে হলে একটু চালাক হতে হবে না হয় সবাই এভাবে ধোকা দিয়ে চলে যাবে।
যাই হোক,যেতে যেহেতু হবেই তাই সি এন জি মামা কে জিজ্ঞেস করলেই উনি বললো ৩৫০ টাকা লাগবে। মামা এভাবে বুকে একটা ধাক্কা দিবে ভাবতেই পারি নি। যদিও আমাদের বনেদী অবস্থা টাকা আসে যায় আসে যায় এমন একটা অবস্থা। যেহেতু আমরা ১০ জন ছিলাম। ৩ টা সি এন জির জন্য হাজার-বারশ খরচ করা মোটেও ফলপ্রসূ মনে হলো না। উঠে গেলাম সিটিং সার্ভিস এ গন্তব্য যাত্রাবাড়ি মোড়। উঠেই আমার চট্রগ্রাম লাইফের সেই ১ নাম্বার বাসের কথা মনে পরে গেল। ঝুলতে ঝুলতে যাত্রাবাড়ি মোড় সেখান থেকে বাসে সদরঘাট৷ এবার একটা ভালো খাবার হোটেল খোজার পালা যেহেতু সাথে বান্ধবীরা ছিলো। যাই হোক, অনেক খোজাখুজির পরও ভালো কোনো হোটেল না পেয়ে কোনোরকম একটা হোটেলে গেলাম। মাছ দিয়ে ভাত খেলাম। তরকারিতা একদমই ভালো ছিলো না কি রান্না করেছে এটা বাবুর্চি আর তার আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। এবার লঞ্চ খোজার পালা গন্তব্য আমতলী। আসার আগেই বিভিন্ন রিভিউ দেখে আমতলীগামী তিনটা লঞ্চ দেখে এসেছিলাম। এম বি শতাব্দী বাধন ( মাস তিনেক আগেই নামানো হয়েছে) , এম ভি ইয়াদ-১, এম ভি তরঙ্গ। সদরঘাট টার্মিনালে ঢুকতেই দেখি সুন্দরী শতাব্দী বাধন দাঁড়িয়ে আছে। আমার চোখ শুরু থেকেই শতাব্দী বাধনের দিকেই ছিলো।শুরুতেই আমরা এই লঞ্চের কাউন্টারে গেলাম। লঞ্চে ঢুকেই সবার এতটাই ভালো লেগেছে যে আমরা আর কোনো লঞ্চে যায় নি। একটু দরকষাকষি করে তিনতলায় রিভার ভিউ একটা ডাবল কেবিন, দুইটা সিঙ্গেল এসি কেবিন নিয়ে নিলাম।সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইন, বড় বড় ঝাড়বাতি সবমিলিয়ে অসাধারণ। লঞ্চ যাত্রা শুরু করবে ৫.৩০ মিনিটে। সময় প্রায় হয়ে এসেছিলো। ব্যাগ পত্র নিয়ে সবাই লঞ্চে উঠে গেলাম।যেহেতু প্রথমবার লঞ্চে উঠেছি৷ শুরু থেকেই আমি অনেক এক্সাইটেড ছিলাম। ব্যাগপত্র রেখে চলে গেলাম লঞ্চের ছাদে দেখতে দেখতে লঞ্চ ঘুরতে শুরু করলো। এই সেই মুহূর্ত যেটার জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম।সন্ধ্যা হওয়ার আগপর্যন্ত পুরোটা সময় লঞ্চের ছাদেই ছিলাম। লঞ্চের আপন গতিতে ছুটে চলা, সূ্র্যাস্তের সময় সূর্যের লাল আভায় যখন নদী রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো এই পরিবেশ টা আসলে চোখে না দেখলে অনুভব করা যাবে না। লঞ্চে মানুষ কম ছিলো সেকারণে ভীড় টাও কম ছিলো। তারপর নিচে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। ওয়াশরুম একদম আমার মেসের ওয়াশরুমের মত। তারপর হালকা আড্ডা মেরে রুমে এক ঘন্টা রেষ্ট নিলাম। বাসার বিছানায় শুয়ে আছি নাকি লঞ্চে বুঝতেই পারলাম না। তারপর রাত ৯ টার দিকে উঠে আবার ছাদে গেলাম।আর এক অপরূপ সৌন্দর্য উপযোগ করলাম। ১২/০৮/২২ সেদিন ছিলো পূর্ণিমা।চাঁদের আলো, নদীর ঢেউ, বাতাস উপভোগ করে আবার নিচে নেমে আসলাম। ইতোমধ্যে রুমে রাতের খাবার হাজির। ভাত, মুরগির রোষ্ট,ডাল। আমার কাছে খাবার খুবই ভালো লেগেছে। এরপর বাইরে চেয়ারে বসে, লঞ্চের নিচ থেকে উপরে বাতাসে ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে রাত ২ টা বাজিয়ে দিলাম। ঘন্টাতিনেক ঘুমানোর পর ভোর ৫ টায় ছাদে যাই। হিমেল হাওয়া,মেঘের মধ্যে সূর্যের উঁকিঝুঁকি দেখতে দেখতে একটু নিচে নেমে আসি। যাবতীয় প্রাতকর্ম লঞ্চেই সেরে নিয়েছি। হালকা বিস্কুট আর ম্যাংগো জুস খেতে খেতে টের পেলাম লঞ্চ আর নড়েচড়ে না। বুঝলাম গন্তব্য চলে এসেছি। একরাত থেকেই লঞ্চ টা কে আমার নিজের বাড়ি বাড়ি মনে হচ্ছিলো তাই ভাবলাম এখনই তাড়াহুড়ো করে নামার দরকার নাই বরং নিজের বাড়িতে আরএকটু থাকি যদিও অন্যরা আমাকে কিঞ্চিৎ তাড়া দিচ্ছিলো নামার জন্য তাদের কথায় খুব একটা কর্ণপাত করি নাই। লঞ্চ জার্নি এত মজার জানলে আরো আগেই বরিশাল যেতাম। এত ভালো লেগেছে যে চিন্তা করতেছি সময় পেলে রাতের লঞ্চে বরিশাল, একদিন থেকে আবার লঞ্চে ব্যাক করবো। যাই হোক,সকাল ৭ টা কিছুক্ষণ পরে লঞ্চ থেকে নেমে আসি। চেকার মাথা গুনেগুনে টিকিট চেক করলো। নেমে দেখি দোকানের সাইনবোর্ড গুলোতে লিখা আছে আমতলী,বরগুনা। একটু অবাকি হলাম। আসার কথা ছিলো আমতলী,পটুয়াখালী চলে এলাম আমতলী,বরগুনা। কি আর করার আবারো সেই গুগলের সাহায্য নিলাম পরে বুঝলাম পায়রা নদীর ঐ পাশ টা বরগুনা। আমতলী হালকা করে এদিকে পরে গেছে। এবার আমাদের যেতে হবে আমতলী থেকে ৪১ কিলোমিটার দূরে কলাপাড়া, কুয়াকাটা। দুইটা অটো নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম কুয়কাটার পথে। দুইপাশের সবুজের সমারোহ, রোদ বৃষ্টি খেলতে খেলতে এক ঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম কুয়াকাটা। পথিমধ্যে তিনটা সুন্দর সুন্দর নদী পরবে। আন্ধারমানিক নদী,সোনাতলা নদী,খাপড়াভাঙ্গা নদী যথাক্রমে। সোনাতলা ব্রীজের উপর থেকে দূরে সুন্দরবনের একটা অংশ দেখা যায়।প্রায় সকাল ৯ টাই কুয়াকাটা পৌঁছাই। একটু খোজাখুজি করার পর ১০ টাই হোটেলে(Hotel exem ডাবল বেডের দুইটা এসি রুম) চেক ইন করি তারপর ব্রেকফাস্ট করার পর সোজা বিচে চলে যায়। গিয়ে দেখলাম তখন জোয়ার, সাগড়ে প্রচন্ড ঢেউ সে যাই হোক সাগড়ে তো নামতেই হবে। মোবাইল,মানিব্যগের মত মহামূল্যবান জিনিসপত্র কে তখন মহাঅপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছিলো। যাই হোক,আশাপাশ খোজাখুজির পরও কোনো লকার খুজে না পেয়ে শেষপর্যন্ত একটা দোকানে রাখি। দোকানের মালিক খুব ভালো মানুষ ছিলেন। প্রায় দুইঘন্টা যাবৎ বিচে লাফালাফি করে হোটেলে এসে শাওয়ার নিয়ে কিচ্ছুক্ষণ রেষ্ট নিলাম। তারপর লাঞ্চ করতে বের হলাম। সবার শখ জাগলো মাছ ভাজা খাবে। ওখানে হোটেলের সামনে মাছ সাজানো থাকে। আপনার পছন্দমত মাছ তারা ভেজে দিবে। আমি একটা বোয়াল মাছ খেয়েছিলাম যদিও এর আগেও অনেকবার খাওয়া হয়েছে।এখানে একটা কথা বলে রাখি যে তিনদিন কুয়াকাটা ছিলাম ব্যাক্তিগতভাবে কোনো খাবারই আমার ভালো লাগে নি। লবণ কম আর মোটা চাল একটা উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে স্বাদ না লাগার। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাত অবদি বিচেই কাটিয়েছি৷ চাঁদের আলোয় সমুদ্রের ঢেউ গুলো যখন দৃশ্যমান হচ্ছিলো তখন মনে হচ্ছিলো এটাই তো সেই রাত যা আমি চেয়েছিলাম।চাঁদের আলোয় কুয়াকাটা তার লুকিয়ে রাখা মায়াবী সৌন্দর্য সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসিয়ে এনে পর্যটকদের মনের তীরে নোঙর ফেলে। আমরা ছিলাম ভাগ্যবান। পূর্ণিমা রাতের কুয়াকাটা উপভোগ করতে পেরেছি। মাঝেমধ্যে গলা ছেড়ে গান আর সেই গানের সঙ্গে সমানতালে সুর তুলে সৈকতে আছড়ে পড়া মিষ্টি সুন্দর ঢেউয়ের সুরলহরি যেন এক অন্য পরিবেশ।এরই মধ্যে রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হোটেলে ব্যাক করেছি। মাঝে অবশ্য ৫ টা বাইক ঠিক করে রেখেছিলাম।আগামীকাল কাল ভোরে তারা আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে।
এখানে কিছু বিষয় বলে রাখা ভালো। কুয়াকাটা কক্সবাজারের মত অতটা উন্নত নয়। বিচের পানি ঘোলা চট্রগ্রামের পতেঙ্গা বিচের মত। পানির লবণাক্ততাও কম। এছাড়া বিচের শোয়ার যে বেঞ্চ গুলো ছিলো সেগুলোতে ফোম না থাকার কারণে খুব একটা আরাম লাগে নি। যে দিকটা আমার ভালো লেগেছে ফটোগ্রাফারদের উৎপাত তেমন একটা চোখে পড়েনি। বিচ বাইক একটাও দেখি নাই। জেট স্কি মাত্র একটা দেখেছিলাম। বিচের সাথেই সারি সারি ফুচকা,চটপটি,ঝালমুড়ির দোকান রয়েছে। বেশকিছু ফিস বারবিকিউর দোকান রয়েছে বিচের পাড়েই। টোনা, কোরাল, কাকড়া, স্কইড,অক্টোপাস ইত্যাদি।
পরদিন সকাল বেলা আমাদের সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার কথা গঙ্গামতীর চরে। পরে সেখান থেকে কাওয়ার চর হয়ে ঝাঊবন। ৪ টা বাজে চোখ খুলতেই দেখি বাইরে ঝুম বৃষ্টি। সাথের দু একজন না যাওয়ার কথা বললেও আমার খুব করে মন চাইছিলো এসেছি যখন যাবোই।বৃষ্টি কখনোই বের না হওয়ার কারণ হতে পারে না। ইতোমধ্যে ৪.৪৫ এর দিকে বাইকার ভাইয়ারা চলে এসেছেন হোটেলের সামনে। আমরা ৫ টাই রওনা করি। বুঝতেই পারছিলাম সূর্য আর দেখা হবে না। কুয়াকাটা ০ পয়েন্ট পার হয়ে বাইক যখন বিচের পাড় দিয়ে যাওয়া শুরু করলো তখন কি যে আনন্দ লাগছিলো এটা আসলে কেউ না গেলে তাকে বোঝানো সম্ভব না। গঙ্গামতি চরের অবস্থান কুয়াকাটা ০ পয়েন্ট থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে। যেটা সানরাইজ পয়েন্ট নামে পরিচিত।
বন আর ধূ-ধূ বালুচরের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়া সাগরের বুকে জেগে উঠা চর। চরাঞ্চলের সৌন্দর্য সুধা অপার আকর্ষণে টানে প্রকৃতি প্রেমী ও ভ্রমণ পিপাসুদের। নির্জনতার স্বাদ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতে চাইলে চলে যেতে পারেন চর এলাকায় ঘুরতে।গঙ্গামতি নামটি যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি আরো আকর্ষণীয় এই চরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য।পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নে গঙ্গামতির অবস্থান।কল্পনার সৌন্দর্যকেও হার মানায় সবুজে ঘেরা শান্ত নির্জন স্নিগ্ধ সৈকতের গঙ্গামতির চর।
প্রকৃতি যেন তার সকল সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এই চরের বুকে। কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়ে গঙ্গামতি না গেলে আপনার কুয়াকাটা ভ্রমণই থেকে যাবে অসম্পূর্ণ। গঙ্গামতির সর্বত্রই যেন সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি। এখানে রয়েছে কয়েকটি স্বচ্ছ নীল জলের লেক আর প্রকৃতির শোভায় মন্ডিত বিশাল বেলাভূমি। সমস্ত বেলাভূমি জুড়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি দেখে আপনার মন হয়ে উঠবে আরো প্রফুল্ল। এই কাঁকড়াগুলো ঠিক যেন নিপুণ হাতে পুরো সৈকত জুড়ে আলপনা এঁকে রেখেছে। যা এই চরের সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। খুব সকালে গঙ্গামতি সৈকতে যদি যান তবে এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা আপনাকে দেবে এক স্বর্গীয় আবেশ। লাল টিপের মত সূর্য সমুদ্রের বুক থেকে এক অপূর্ব রূপ নিয়ে উদিত হয়। আর এই সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে গঙ্গামতির বেলাভূমিতে।যদিও আমরা সূর্যাদয় দেখতে পাই নি কারণ আকাশ পুরো ঘন মেঘে ঢাকা ছিলো। প্রচন্ড ঝড়ের কবলে পরেছিলাম।এই প্রথম সাগড় পাড়ে বসে এমন ঝড় দেখেছি। ঝড়ের বাতাসে ঝাঊ গাছ গুলোকে দেখে মনে হচ্ছিলো নিজেকে আঁকড়ে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়েই বুঝতে পারছিলাম এখান থেকে সূর্যোদয় কতটা সুন্দর হতে পারে।
গঙ্গামতির সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণতা দান করেছে ‘গঙ্গামতি খাল’।গঙ্গামতিকে দু’ভাগ করে মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বনের ভেতরে চলে গেছে এই খালটি। গঙ্গামতি সৈকতের একেবারে পশ্চিম দিকে এই খালের অবস্থান। এই খালে নৌকা ভ্রমণ করা যায়। খালের স্বচ্ছ জলাধার আর তার দুই তীরের প্রকৃতির অপরূপ শোভায় দারুণ এক নৌকাভ্রমণ হয়ে যাবে আপনার।
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি মধ্যে আমরা চলে গেলাম কাওয়ার চরে।অপরুপ সৌন্দর্যের লীলা ভূমি কুয়াকাটার কাউয়ার চর।একদিকে সাগরের গর্জন অন্য দিকে বিশাল কেউরা বন আর সৈকতে লাল কাঁকড়ার বিচরণ ভূমি এ এক অনন্য স্থান।চোখ জুরাবে কাউয়ার চরের বেলাভুমির লাল কাঁকড়ার ছুটে চলা।হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার আবাসভুমি কাউয়ার চরের সমুদ্র সৈকত।সাগরের জল সাদা ঢেউ আর সৈকতের রুপালি বালি যে কোন পর্যটকের মন কেড়ে নিবে।সৈকতের কোল ঘেঁষে বনের ভিতর আছে কিছু জেলে পল্লি। এখনে দেখা যায় তাদের জীবন ধারণ। কেউ জাল বুনছে কেউবা সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কাওয়ার চরে কিছু সময় থেকে আমরা চলে গেলাম ঝাউ বনের দিকে। এতক্ষণে কালো মেঘের ঘনঘটা চারদিক গ্রাস করে ফেলেছে। ঝাউবনে একটা চায়ের দোকান পেয়েছিলাম।প্রচন্ড ঝড়ে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে এক কাপ গরম লাল চা কে অমৃত মনে হচ্ছিলো। কেউ কেউ একটু ভয়ে ভীত বা আতঙ্কিত হলেও আমার ভালোই লাগছিলো। এই ঝড়ের মধ্যে আমি দু একবার সাগর তীরে চক্কর দিয়ে এসেছিলাম। এখানে প্রায় ঘন্টাখানেক বসে ছিলাম কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই।সিদ্ধান্ত হলো এই ঝড়-তুফানের মধ্যেই ফিরে যাবো। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো যেদিকে এসেছি ওদিকেই ফিরে যাওয়া মানে বিচের পাড় দিয়ে কিন্তু ততক্ষণে জোয়ার সেই সাথে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ার কারণে সাগর প্রচন্ড উত্তাল হয়ে উঠেছিলো তার উপর ৩ নাম্বার সর্তক সংকেত ছিলো। তাই আমরা মিশ্রি পাড়া হয়ে ফিরে এসেছি।
মিশ্রি পাড়া বৌদ্ধ বিহার, মিষ্টি পানির কূপ, রাখাইন পল্লি তে যাওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিলো না কারণ স্পট গুলো আমার কাছে ওভাররেটেড মনে হয়েছে৷ পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি তে আমার বাসা হওয়ার সুবাধে অনেক সুন্দর সুন্দর কারুকার্যখচিত বৌদ্ধ বিহার দেখার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।
আবহাওয়ার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিলো এই অবস্থা আগামী দুই তিন দিনেও ঠিক হবে না। বাইকার ভাইরা বললো ভাই এই অবস্থা আগামী দুই তিন দিন থাকবে যেহেতু আপনারা ভিজেই আছেন চলেন এখনি লেবুর চর,ফাতরার বন, তিন নদীর মোহনা ঘুরে আসি। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো তিন নদীর মোহনা থেকে সূর্যাস্ত খুব সুন্দর দেখা যায়।কুয়াকাটা ০ পয়েন্ট থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান। মূলত এই সাইট বিকালের পরিকল্পনায় ছিলো।
যাই হোক, ভাইদের কথা মত সরল মনে বললাম ওকে ভাই চলেন জীবনে আর কি আছে। বৃষ্টির মধ্যে বাইকে ঘুরতে আমার ভালোই লাগছিলো। অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর বাইক যখন সমুদ্রের তীরে পৌঁছালো তখন দেখলাম রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে আছে যা বাইক চালানোর জন্য একেবারেই অনুপোযগী। বাইকার ভাইরা বললো চলেন ভাই হেটে হেটে যায়। আমিও বললাম চলেন ভাই কিন্তু গ্রুপ মেম্বারদের প্রায় সবাই ভেটো দেওয়ার কারণে সেটা আর সম্ভব হয় নি। ওখান থেকে সরাসরি ভেজা শরীর নিয়ে হোটেলে ফিরে এসেছি।ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে রেষ্ট নিয়ে বিকালে যখন বিচে গেলাম তখন আকাশ মেঘলা থাকলেও ঝড় বৃষ্টি ছিলো না। তখন মনে হলো তিন নদীর মোহনায় এখন গেলে ভালো হতো।সকালে বাইকারদের কথা সরল মনে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম।আবারো প্রমাণ হইলো সরলতার কোনো দাম নাই। তবে এটাও সত্য যে সকালে আবহাওয়ার যা অবস্থা ছিলো বিকালে কি হবে সেটা কারো পক্ষেই অনুমান করা সম্ভব ছিলো না। কি আর করা সবার কপালে সবকিছু জুটে না।যেমন আমার কপালে একটা প্রেমিকা জুটে না। বিচে কিছু সময় হাটাহাটি করার পর মনে হলো একটু বসা দরকার। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বেঞ্চ নিয়ে নিলাম বসার জন্য। কি কপাল! বসার ১০ মিনিট পার না করতেই কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই ঝড়-তুফান শুরু হয়ে গেল। কিছুসময় নিজেকে ছাতা দিয়ে রক্ষা করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করলাম পরে ভাবলাম লাভ নাই। পরে এক ফুচকা মামার ত্রিপল এর নিচে আশ্রয় নিলাম। এই বৃষ্টিতে নাগা মরিচ দিয়ে গরম গরম ফুচকা চটপটি হলে মন্দ হয় না। সাথে সাথে মেরে দিলাম।এই প্রথম কুয়াকাটাতে কিছু খেয়ে আমার ভালো লেগেছে৷ রাতে আরো কিছু সময় বিচে মেঘ বৃষ্টি খেলতে খেলতে হোটেলে চলে গেলাম। রাত ১২ টা বাজতেই বুঝলাম ভোজন করা বাঞ্চনীয় এখন। অনেককে বললাম চল খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিচ থেকে হাওয়া খেয়ে আসি। কেউ রাজি হল না যেতে। আমিও সুন্দর করে একলা চলার নীতি ফলো করলাম।জীবনে চলার পথে একলা চলতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ধীরে ধীরে খাওয়া-দাওয়ার পর টানা এক ঘন্টা বিচে একলা একলা বসে ছিলাম।এরইমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের সাথে ফোনালাপ সেরে নিলাম। রাত ১.৩০ মিনিটে হোটেলে গিয়ে সোজা ঘুম। রুমে একটা ভ্যাপসা গরম থাকার কারণে রাতে তেমন একটা ঘুম হয় নি। উঠা বসার মধ্যেই ছিলাম। সকাল ১০ টাই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। আজকে আমাদের কুয়াকাটায় তৃতীয় দিন।যদিও আজকে আমিসহ আমার আর এক বন্ধুর বরিশাল যাওয়ার কথা ছিলো। কোনো একটা কারণে সেটা সম্ভব হয় নাই। যাই হোক,এবার সিলেট ব্যাক করার জন্য টিকিট কাটার পালা। বেশকিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর ভালো কোনো বাস না পেয়ে শেষপর্যন্ত আল-মোবারাকাতে টিকিট করলাম। টিকিট কেটে বিচে গিয়ে কিছু সময় বসার পর মনে হল লেবুর চর, ফাতরার বনের দিকে একটু ঘুরে আসি। আবার কবে না কবে আসি। যেই কথা সেই কাজ আমি সহ আমার এক বন্ধু সহ একটা বাইক নিয়ে গেলাম ফাতরার বনে
সুন্দরবনের বর্ধিত অংশ এই চরটি কুয়াকাটার পশ্চিমে অবস্থিত। কুয়াকাটা সৈকতের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান হল এই ফাতরার চর। সুন্দরবনের বর্ধিত অংশ হওয়ায় মোটামোটি বড় এই বনটিও লবনাক্ত।
বনের ভিতরে কিচ্ছুক্ষণ হাটাহাটি করে সৌন্দর্য অবলোকন করার চেষ্টা করলাম। লেবুর চরে বসে লেবুর শরবত খেলাম।ইতোমধ্যে খোকন ভাই( বাইকার) এর সাথে আড্ডা জমে উঠলো। প্রায় এক ঘন্টা লেবুর জুসের সাথে আড্ডা চললো। দুপুড় ১ টার দিকে হোটেলে ফিরে আসলাম।
বিকাল ৪ টাই গাড়ি। লাঞ্চ করে যখন ৩.৩০ মিনিটে হোটেল থেকে চেক আউট করি তখন দেখি আকাশে ফকফকা রোদ। কি সুন্দর নীল আকাশ। আহা! একেই বলে ভাগ্য চক্র।যখন যেটা দরকার সেটা পাওয়া যায় না।
আসার সময় ট্যুরমেট ছিলো আল-মোবারাকা।দুরপাল্লার বাস হিসেবে একেবারেই ভালো ছিলো না। এসব গাড়ি জেলা টু জেলা ট্রান্সপোর্টেশান এর জন্য। ৪০ সিট এর গাড়ি-লেগ স্পেস কম,লেগ রেষ্ট তো আকাশ কুসুম কল্পনা, দুইসিটের মাঝে হাতল নাই,সিট গুলো লো কোয়ালিটির অতটা আরামদায়ক না।শুরুর দিকে গাড়ির টান ও তেমন ছিলো না। যাই হোক,ক্লান্ত থাকার কারণে তেমন একটা টের পাই নি। ভোর ৪.৩৩ মিনিটে হুমায়নরশিদ চত্বর,সিলেটে নেমে যে যার যার গন্তব্য চলে গেলাম।
কুয়াকাটা নিয়ে অনেক ধরনের নেতিবাচক রিভিউ দেখলেও ওভারঅল কুয়াকাটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে এবং আমি আবারো যেতে চাই।
প্রয়োজনীয় তথ্য-
সিলেট-ঢাকা-ইউনিক নন এসি বাস -৬৮০/-
আপনি তিনটি ওয়েতে লঞ্চে কুয়াকাটা যেতে পারেন-
১-ঢাকা-বরিশাল(লঞ্চ) তারপর বাসে বরিশাল- কুয়াকাটা(১১১ কিলোমিটার)
২-ঢাকা-পটুয়াখালী(লঞ্চ) তারপর বাসে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা(৭১ কিলোমিটার)
৩-ঢাকা-আমতলী(লঞ্চ) তারপর অটোতে আমতলী টু কুয়াকাটা(৪১ কিলোমিটার)
আমরা আমতলী হয়ে গিয়েছিলাম। ঢাকা সদরঘাট থেকে আমতলীগামী লঞ্চ গুলো বিকাল ৫.৩০-৬.০০ টার মধ্যে আমতলীর উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে।
মোটামুটি ১৩ ঘন্টার মত লাগে আমতলী পৌঁছাতে।
আমরা শতাব্দী বাধন লঞ্চে গিয়েছিলাম।মাস চারেক আগেই এটা নামানো হয়েছে৷ কন্ডিশান বেশ ভালোই।
ডেকের ভাড়া-৫০০/- + ৩০% বর্ধিত
সোফা -১০০০/- + ৩০% বর্ধিত ( সোফা গুলো দেখে বেশ আরামদায়ক মনে হয়েছে। একদম শুয়ে শুয়ে যেতে পারবেন। সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং এসি রুম। এনাফ এসি আছে গরম লাগার প্রশ্নই আসে না।
সিঙ্গেল কেবিন -১৪০০/- +৩০% বর্ধিত
ডাবল কেবিন-২৭০০/- +৩০% বর্ধিত
সিঙ্গেল কেবিনে একজন এবং ডাবল কেবিনে দুইজন থাকতে পারবেন। এখন এই একজন বা দুইজন এর বাইরে আপনি চাইলে ৩০ জন ও উঠাতে পারবেন কিন্তু বাকি ২৮ জনের জন্য ডেকের ভাড়া দিতে হবে।
আমরা দুইটা সিঙ্গেল কেবিন, একটা ডাবল কেবিন নিয়েছিলাম। যেহেতু আমরা ১০ জন তাই ৬ জনের ডেকের ভাড়া দিতে হয়েছে।
আর সবগুলো কেবিনেই এসি আছে।এনাফ লাইট এবং সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইন।
আমতলী-কুয়াকাটা - অটো ৫৫০-৬০০ টাকা
তারা হাজার-বারশ টাকা চাইবে। দামদর করে নিতে হবে। প্রায় ১ ঘন্টা সময় লাগবে কুয়াকাটা পৌঁছাতে।
সদরঘাটে ঢুকার সময় টার্মিনাল ভাড়া জনপ্রতি ১০/- টাকা করে দিতে হবে।
হোটেল- আমরা Hotel exem এ ছিলাম।দুইটা ডাবল বেডের এসি রুম। পারডে ১২০০ টাকা করে। দুইরাত ছিলাম টোটাল ৪৮০০/- টাকা।হোটেল ফেয়ার এসি নন এসি প্রায় সেইম। চাইলে আর একটু খোজাখুজি করলে আরো কমে হোটেল পাওয়া সম্ভব।
খাওয়া-দাওয়া-প্রতিবেলা খাওয়া ১৫০-২০০ করে। আমার তিনদিনের অভিজ্ঞতা বলে মোটামুটি ভালো খেতে চাইলে পার বেলা ১৫০ করে খরচ করতে হবে৷ তাও খুব বেশি যে ভালো বিষয়টা এমন ও না।
বাইক রেন্ট- সকাল বেলা- গঙ্গামতীর চর,কাওয়ার চর,ঝাউ বাগান -বিচ পার্ট
এরপর মিশ্রি পাড়া বৌদ্ধ বিহার, রাখাইন পল্লি, মিষ্টি পানির কূপ।
গঙ্গামতীর চর থেকে সূর্যোদয়
যাওয়ার সময় একটা খাল পার হতে হবে
জনপ্রতি ২৫/- টাকা।
বিকাল বেলা - লেবুর চর, ফাতরার বন,তিন নদীর মোহনা
তিন নদীর মোহনা থেকে সূর্যাস্ত
সকাল -বিকাশ মিলিয়ে বাইক ভাড়া ৮০০-১০০০/- টাকা
আমরা ৫ টা বাইক ৮০০/- টাকা করে নিয়েছিলাম।
বিচে বসার বেঞ্চ ঘন্টাপ্রতি ৪০ টাকা
বিচের আশপাশে কোনো লকার খুজে পাই নি।
ভ্যান দেখলাম বেশ কিছু উঠলেই ১০ টাকা এমন আর কি।
কুয়াকাটা -সিলেট - ১২০০/- ( আল-মোবারাকা নন-এসি বাস)
পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই কোথাও কোনো ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। প্লাষ্টিক সহ অন্যান্য জিনিস নির্দিষ্ট বিনে ফেলবেন।
"দেশ আমার,পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও আমার"।
লেখাঃ Parijat Choudhury