16/03/2020
ঐতিহ্য ঘেরা আগরতলা শহরে দুই দিন।
অনেক দিন থেকে আগরতলা যাওয়ার ইচ্ছা,ঠিক ছোটবেলা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় যখন ভেসে উঠত দূরদর্শন কেন্দ্র আগরতলা।তাই এবারের ভ্রমন ঐতিহ্য ঘেরা আগরতলা,ছোটবেলা থেকে ধারণ করা ইচ্ছাটার জন্য। আখাউড়া থেকে সীমানা পেরোলেই আগরতলা শহর। তাছাড়া প্রাচীন রাজা মহা রাজাদের আদি নিবাস, শহরজুড়ে রাজাদের নানান নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত, কোলাহল মুক্ত একটা পরিচ্ছন্ন পরিপাটি ছোট শহরে এমনিই হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই উপভোগ্য ।
প্রথম দিন- পায়ে হেঁটে আগরতলা শহর :
৮ই নভেম্বর সকাল সাড়ে ছয়টায় কমলাপুর থেকে পারাবত ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু আগতলার দিকে। যেহেতু তিন দিনের ছুটি তাই মনে মনে তিন ঘণ্টার প্রস্তুতি ইমিগ্রেশন আর কাস্টমের জন্য । সকাল নয়টায় পৌঁছলাম আজমপুরে, সিএনজি করে আখাউড়া চেকপোস্ট মাত্র বিশ মিনিটের পথ। সেখানে গিয়ে দেখি ট্রাভেল ট্যাক্সের লম্বা লাইন,সবার হাতে একাধিক পাসপোর্ট। আমাদের ঢাকা থেকে ট্রাভেল ট্যাক্স দেয়ার কারনে মাত্র ৪০ মিনিটে আমাদের দুই দেশের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমের কাজ শেষ।সকাল দশটায় আমরা আগরতলায়।
আগরতলা প্রবেশ করে চা পর্ব শেষ করে চলে গেলাম হোটেলে ,জগন্নাথ বাড়ি রোড। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর বের হলাম পায়ে হেঁটে আগরতলা শহর দেখতে, গুগল ম্যাপ হিসেবে সবকিছুই এক কিলো মিটারের মধ্যে।প্রথমে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম পোস্ট অফিস চৌমুনিতে,যেটা কামান চৌমুনি নামে পরিচিত। সেখানে মুক্তি যুদ্ধে ব্যবহৃত দুটি ট্যাঙ্ক রয়েছে।এখানে নিউ আদর্শ হোটেলে দুপুরের খাবার সেরে,রাস্তার ওপাড়ে ত্রিপুরা কংগ্রেস ভবনের সামনে এক কাপ চা শেষ করে হরি গঙ্গা বসাক রোড ধরে মোটর স্ট্যান্ড পার হয়ে সোজা গেদু মিয়ার মসজিদে ।প্রাচীন এই মসজিদটি দেখতে অনেকটা পুরান ঢাকার তারা মসজিদের মত।
গেদু মিয়ার মসজিদ থেকে পনের মিনিট হাঁটার পথ ত্রিপুরা রাজবাড়ি ,যা সরকারী মিউজিয়াম উজ্জয়ন্ত প্যালেস নামে পরিচিত।মহারাজা রাধা কিশোর মাণিক্য এই প্রাসাদের স্থপতি। এখানে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ নিয়ে দুর্লভ তথ্য বহুল একটি গ্যালারি রয়েছে।
প্রাসাদ থেকে বের হয়ে একটু বাদিকে গেলেই পরবে প্রাচীন লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির ।সেই পথ ধরে সামান্য এগিয়ে বাদিকে গেলেই আকাশবাণী আগরতলা।
ধীরে ধীরে বিকাল শেষে নামল সন্ধ্যা ।সন্ধ্যায় যেন আরও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল আগরতলা।সন্ধ্যায় আবার পোস্ট অফিস চৌমুনিতে।বিকালের চা পর্ব শেষ করে আশে পাশে সপিং মল আর বিগ বাজার ঘুরে শেষ করলাম প্রয়োজনীয় কেনাকাটা।
দ্বিতীয় দিন- সিপাহিজলা অভয়ারণ্য,উদয়পুর এবং নীরমহলঃ
ঘুম ভাঙল খুব সকালে ,তখনো মনে হয় আগরতলাবাসি শেষ রাতের ঘুমে মগ্ন। সকাল আটটায় নাস্তা করলাম আগরতলার বিখ্যাত শেরওয়ালি সুইটস এ। রাজবাড়ির সামনে থেকে সারা দিনের জন্য একটা গাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু সিপাহিজলা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য,উদয়পুর আর নীরমহলে।
আগরতলা থেকে মাত্র ২৫ কিমি দূরে সিপাহিজলা অভয়ারণ্য, অনেকটা মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মতোই । আয়তন মাত্র ১৯ বর্গকিমি হলেও জীব বৈচিত্রের জন্য এই অভয়ারণ্যে খ্যাতি রয়েছে। প্রায় সাড়ে ৪০০ রকমের উদ্ভিদের আবাসস্থল এই অভয়ারণ্য। আগরতলা থেকে সিপাহিজলা যাবার পথটি বেশ রোমাঞ্চকর।
উদয়পুর, আগরতলা থেকে দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। মধ্যযুগে ত্রিপুরার রাজাদের রাজধানীও ছিল এই উদয়পুর। সে সময় রাঙামাটি নামেই পরিচিত ছিল এই জায়গাটি। ত্রিপুরার উদয়পুরকেও ‘লেক সিটি’ বলাই যায় নির্দ্বিধায়। সুখসাগর, অমরসাগর, জগন্নাথ দিঘি, মহাদেব দিঘি ইত্যাদি সুদৃশ্য জলাশয় সৌন্দর্য বাড়িয়েছে উদয়পুরের। আবার মন্দির-নগরীও বলা যেতে পারে উদয়পুরকে। ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, গুণবতী মন্দিররাজি, বিষ্ণু মন্দির, মহাদেব মন্দির, দুর্গামন্দির, জগন্নাথ মন্দিরের মতো প্রাচীন ও বিখ্যাত মন্দিরগুলির অবস্থান এখানেই।
গোমতী নদীর তীরে মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য দেবী ভুবনেশ্বরীর মন্দিরটি নির্মাণ করান ১৬৬০-১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, এই মন্দিরটি অবশ্য বিগ্রহহীন। অতীতে এই মন্দিরে নাকি নরবলি দেওয়া হত। এমনটাই জনশ্রুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নিয়েই রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জন’ এবং উপন্যাস ‘রাজর্ষি’। মন্দিরের পাশেই রয়েছে প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।
নীরমহল-নামকরণ থেকেই বোঝা যায় জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে মহল, উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র জলমহল হল এটি। আগরতলা থেকে ৫১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত জনপদটির নাম মেলাঘর। মেলাঘরের দুই কিলোমিটার দূরেই অবস্থান নীরমহলের। বিশাল রুদ্রসাগর সরোবরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব এই রাজপ্রাসাদ। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শুরু করান এই সুদৃশ্য প্রাসাদটির। প্রাসাদের স্থাপত্যে মুঘল শৈলীর প্রভাব যথেষ্টই বোঝা যায়।
সারা দিন শেষে সন্ধ্যাটা কাটালাম উদ্দেশ্যহীন ভাবে আগরতলা শহর ঘুরে তারপর সিনেমা দেখা রূপসী সিনেমা হলে।পরদিন সকাল আটটায় আগরতলা ছেড়ে,সাড়ে এগারটায় আজমপুর থেকে কালিনী এক্সপ্রেস ধরে দুপুর দুইটায় ঢাকা।
আখাউড়া-আগরতলা সম্পর্কে কিছু তথ্য :
ঢাকা থেকে আগরতলা ট্রেনে কম সময়ে যাওয়া যায়, আজমপুর ,আখাউড়া । সেখান থেকে সিএনজি করে আখাউড়া চেকপোস্ট মাত্র বিশ মিনিটের পথ। সরাসরি বাস আগরতলা যায় কিন্তু সময় ছয় ঘণ্টার বেশি লাগে ।ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে দিয়ে গেলে অনেকটা সময় বাঁচানো যায়। অবশ্যই ডলার এনডোর্সমেন্ট করে নিতে হবে নাহলে দুই দেশের পোর্টে অনেক ঝামেলা করে। আসার সময় কেনাকাটার বিলের কপি/ডলার ভাঙানোর স্লিপ আগরতলা কাস্টমে দেখাতে হয়। আগরতলা ইমিগ্রেশন কিছুটা ধীর গতির।
হোটেল নিতে পারেন পোস্ট অফিস চৌমুনি বা এর আশেপাশে কারন বিগ বাজার থেকে শুরু করে সব সপিং মল এখানেই। খাবারের জন্য KFC,শেরওয়ালি সুইটস, নিউ আদর্শ হোটেল,স্বস্তি নিরামিশ হোটেল।
ঘুরার জন্য গাড়ি পাবেন রাজবাড়ির সামনে এবং মটর স্ট্যান্ড এ।
প্রকৃতি ও পরিবেশের পরিছন্নতা আর সৌন্দর্য রক্ষার মধ্যদিয়ে আমাদের ভ্রমন হোক আনন্দময়।
Collected by ToB