08/09/2018
🌱 লুব্রিকেন্ট/ইন্জিন অয়েল সম্পর্কে যা কিছু জানা প্রয়োজনঃ
লুব্রিকেন্ট হল বাইকের কাছে রক্তের মত একটা বস্তু। মানুষ যেমন রক্ত ছাড়া বাচতে পারে না, তেমনই বাইক ও ইন্জিন অয়েল ছাড়া অচল।
👀 সহজ ভাষায় লুব্রিকেন্ট/ ইঞ্জিন অয়েল কি?
যে কোন মুভিং পার্টসেই ঘর্ষণ হয়, আর ঘর্ষণ এর ফলে ক্ষয় তো হবেই যেটাকে বলা হয় (wear and tear)। এই wear and tear কমানোর জন্য আমরা যা ব্যবহার করি তাই হল লুব্রিকেন্ট। তার মানে হল ঘর্ষণ এর ফলে ক্ষয় কমানোর জন্য (বন্ধ করার জন্য না কিন্তু, এইটা সম্ভব না) আমরা যা ব্যবহার করি তাই লুব্রিকেন্ট।
👀 গাড়িতে তো আর মুভিং পার্টস এর অভাব নাই। ইঞ্জিন,চাকা সব কিছুতেই মুভিং পার্টস আছেই। ইঞ্জিনের জন্য ইঞ্জিন অয়েল, গিয়ারের জন্য গিয়ার অয়েল, চাকার জন্য চাকা বা হুইল অয়েল বলে কি কিছু আছে?
আছে, চাকা তে আমরা যে গ্রিজ ব্যবহার করি সেটা ও লুব্রিকেন্ট। গ্রিজ ও কিন্তু ঘর্ষণ কমানোর জন্য ই ব্যবহার করা হয়।
পদার্থের যেমন তিন অবস্থা তেমনি লুব্রিকেন্ট এর ও তিন অবস্থা শুধু গ্যাস এর বদলে সেমি-লিকুইড।
👌লিকুইড লুব্রিকেন্ট (ইঞ্জিন বা গিয়ার অয়েল)
👌 সেমি-লিকুইড লুব্রিকেন্ট ( গ্রিজ )
👌 আর সলিড লুব্রিকেন্ট (গ্রাফিন, গাড়িতে ব্যবহার হয় না)
ব্রেক অয়েল ও কিন্তু আছে, সেটা কিন্তু লুব্রিকেন্ট না কারন ওইটা পাওয়ার ট্রান্সমিশন করে, ঘর্ষণ এর ফলে ক্ষয় কমায় না।
👀 এখন কি কাজ করে এই লুব্রিকেন্ট?
১) ঘর্ষণ কমাই..
২) ঘর্ষণ কমলে স্মুথনেস বাড়ে..
৩) স্মুথনেস বাড়লে পাওয়ার লস কম হয়..
৪) পাওয়ার তো তাপ হিসাবে লস হয় তাই পাওয়ার লস যেহেতু কমায় তার মানে তাপ কম বের হয় মানে লুব্রিকেন্ট কুলিং এর কাজ ও করে..
৫) এত কিছু করলে গাড়ির খরচ পাঁতি ও কমে মানে মেইনটেনেন্স খরচ কমে যায়..
৪-৫ টা কাজ সে করে যেগুলা একটা অন্যটার সাথে কিভাবে রিলেটেড সেটা আমরা দেখলাম।
👀 এখন জানব একটা ভালো লুব্রিকেন্ট এর কি কি বৈশিষ্ট থাকা উচিৎ...👇👇
১) Viscosity Index:
Viscosity Index বেশি থাকতে হবে (বেশি আবার খুব বেশি না, যথাযথ ভাবে থাকতে হবে)। Viscosity হল ফ্লুয়িড প্রবাহিত হতে যে বাধা সেটা। যেমন পানির চেয়ে মধু আস্তে আস্তে প্রবাহিত হয়, মানে বাধা বেশি। মানে মধুর Viscosity বেশি। যার Viscosity বেশি সে অনেক চাপে ও সংকুচিত হয় না বা খুব কম সংকুচিত হয়। আবার এই Viscosity তাপমাত্রা বাড়লে কমে যায়। আর Viscosity Index হল তাপমাত্রার সাথে Viscosity এর পরিবর্তন।
২) Flash and Fire Points:
Flash and Fire Points অপারেটিং মানে লুব্রিকেন্ট টা যে অঞ্চলে অথবা যেখানে ব্যবহার করা হবে সেখানের বা সে অঞ্চলের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি হতে হবে তা না হলে লুব্রিকেন্ট নিজেই জ্বলে উঠবে।
৩) Cloud and Pour points:
Cloud and Pour points অপারেটিং মানে লুব্রিকেন্ট টা যেখানে ব্যবহার করা হবে সেখানের তাপমাত্রার চেয়ে কম হতে হবে। লুব্রিকেন্ট টা যদি আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা করা হয় তাহলে একটা সময় এটা ঠাণ্ডা হয়ে কুয়াসার মত হবে আরও ঠাণ্ডা করলে সেটা এক সময় আর প্রবাহিত হবে না। প্রথম অবস্থাকে Cloud Points আর পরের অবস্থাকে Pour Points বলে। এখন Cloud and Pour Points যদি অনেক কম না হয় তাহলে দেখা যাবে ঠাণ্ডার দেশে লুব্রিকেন্ট জমে বরফের মত হয়ে যাবে ।
৪) Oiliness:
এটার অনেক বেশি পিচ্ছল ভাব (oiliness) থাকতে হবে।
আরও কিছু আছে যেমন volatility কম হতে হবে না হলে লুব্রিকেন্ট উড়ে যাবে, detergent quality ভালো থাকতে হবে, Carbon deposit কম হতে হবে এই সব হল একটা আদর্শ লুব্রিকেন্ট এর বৈশিষ্ট্য আর কেন এই গুলা থাকা দরকার সেটাও কিছুটা বললাম।
👀 এতক্ষণ আমরা দেখলাম ভাল লুব্রিকেন্ট কি? এর বৈশিষ্টগুলো কি আর কেনই বা কোন লুব্রিকেন্টকে ভাল লুব্রিকেন্ট বলা হবে। এখন কথা হচ্ছে ভালোর তো শেষ নাই, বাজারে গেলেন আপনাকে একটা লুব্রিকেন্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল ভাই এইটা ভাল তখন আপনি কি করে বুঝবেন?এইটা তো আর মিষ্টি না যে একটু খেয়ে দেখলাম ভাল হলে নিব না হলে বাদ! সেই সুযোগ লুব্রিকেন্ট এর ক্ষেত্রে নেই। তাহলে উপায়?
👉 👉 উপায় হল কিছু ইন্সিটিউট (API, SAE) আছে যারা লুব্রিকেন্ট এর ক্লাসিফিকেশন ও বৈশিষ্টের এর উপর ভিত্তি করে গ্রেডিং দিয়ে থাকে। আমরা সবাই যেন ভাল ভাবে বুঝতে পারি আমাদের কোন লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা দরকার। এই কাজটা এনারই করে দেন।
আসুন আমরা কমন কিছু ইঞ্জিন অয়েলের ক্লাসিফিকেশন এবং কিসের জন্য ব্যবহার করা হয় জেনে নিই।
API – American Petroleum Institute
SAE (Society of Automotive Engineers)
JASO – The Japanese Automotive Standards Organization
“S” grade stands for Petrol vehicles. (Sprak Ignition)
“C” grade stands for Diesel vehicles.(Compression)
“W” for Winter
Multi grade
Single grade
EP – Extra Pressure
MA – Grade for Wet Clutch type vehicles (HIGH FRICTION VEHICLES. Non Clutch Slipping Oil)
MA2- Next version of MA(HIGH FRICTION VEHICLES Non Clutch Slipping Oil)
MB – LOW FRICTION VEHICLES(NOT RECOMMENDED. Clutch Slipping Oil)
👀 এখন দেখি বাজারে কি রকম লুব্রিকেন্ট পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ টার বেশি কোম্পানির লুব্রিকেন্ট পাওয়া যায় যেগুলা ৩ রকমের।
👌মিনারেল লুব্রিকেন্ট
👌সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট
👌সেমি-সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট
এখন এই গুলার পার্থক্য কোথায় ?
পার্থক্য হল BASE OIL.
এবার প্রশ্ন আসবে এইটা আবার কি?
সব কিছুর একটা মূল উপাদান থাকে, যেমন চাল দিয়ে ভাত রান্না করা হয়, কাচ্চি ও হয়, খেচুড়ি, পায়েস, জর্দা অনেক কিছু হয় এই সবগুলার মুলে থাকে চাল ওইটাই হল BASE। তেমনি লুব্রিকেন্ট এর জন্য মূল উপাদান কে বলা হয় Base Oil.এই Base Oil এর সাথে বিভিন্ন রকম উপাদান (Additives) যুক্ত করে সব কোম্পানি লুব্রিকেন্ট তৈরি করে ।
এই Base Oil আবার ৩ রকম-
১) SN-150
২) SN-500
এই দুইটা মিনারেল লুব্রিকেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
৩) SBS-150
ব্যবহৃত হয় সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট তৈরিতে।
সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট এর কোয়ালিটি খুবই ভালো। অর্থাৎ একটা ভালো লুব্রিকেন্ট এর সব বৈশিষ্ট এতে মিনারেল লুব্রিকেন্ট এর তুলনায় বেশি।
কিছু কিছু কোম্পানি মিনারেল লুব্রিকেন্ট এর সাথে সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট মিশিয়ে সেমি-সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট তৈরি করে। আর এইটার কোয়ালিটি নির্ভর করে মিনারেল লুব্রিকেন্ট ও সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট এর অনুপাতের উপর।
👀 এখন কিছু কোড ব্যবহৃত হয় লুব্রিকেন্ট এর পরিচয় হিসাবে। এইটা দিয়ে এর কিছু বৈশিষ্ট বোঝা যায়। লুব্রিকেন্ট এর বোতলে লেখা থাকতে পারে
SN/CI, SAE 10W30 or SAE 20W50
SN অথবা CI এই দুইটার ব্যাখ্যা প্রথমে দেই..
এখানে প্রথম ২ টা বর্ণ ২ টা ব্যাপার বোঝায়।
S হল পেট্রোল বা SI Engine এর জন্য আর
C হল CI বা Diesel Engine এর জন্য।
তাহলে যদি বাইকের জন্য লুব্রিকেন্ট কিনতে যায় তাহলে খেয়াল রাখব যেন S থাকে আর বাস ট্রাক এর জন্য হলে C থাকতে হবে।
এখন যায় পরের বর্ণ দু'টাতে,
দিনে দিনে প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, অনেক উন্নত মানের গাড়ি ও তৈরি হচ্ছে এবং অবশ্যই সেই গাড়ির জন্য ১০০ বছর আগে যে কোয়ালিটির লুব্রিকেন্ট তৈরি হয়েছিল সেটা ব্যবহৃত হবে না। তার মানে লুব্রিকেন্ট অয়েল ও দিনে দিনে আপগ্রেড হচ্ছে। Last Letter (বর্ণ) টা বোঝায় লুব্রিকেন্ট কতটা Upgraded।
প্রথম যখন পেট্রোল ইঞ্জিনের জন্য লুব্রিকেন্ট তৈরি হয় তখন তার নামকরণ ছিল, SA তারপর আসল SB তারপর SC তারপর SD এভাবে SL, SM এবং এখন সর্বশেষ ভার্সন SN, এর থেকে আপগ্রেডেড কোন লুব্রিকেন্ট অয়েল পেট্রোল ইঞ্জিনের জন্য নাই।
তেমনি ডিজেল ইঞ্জিনের জন্য প্রথমে ছিল CA পরে CB এখন CI পর্যন্ত পাওয়া যায়। মানে Last Letter টা যত পিছাবে তত Upgraded।
আশা করি বুঝা গেল SN মানে কি আর CI মানে কি!
👀 এতো গেল কোন ইঞ্জিনের জন্য কোন লুব্রিকেন্ট। এখন ইউরোপের দেশের যানবাহনের পেট্রোল ইঞ্জিন আর বাংলাদেশের যানবাহনের পেট্রোল ইঞ্জিনের জন্য কি একই অয়েল ব্যবহার করব?
👉👉 ঐখানে শীতকালে তাপমাত্রা -১০ এ চলে যায় আবার দুবাইতে গরমকালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি উঠে যায়। এখন আগেই বলা হয়েছে লুব্রিকেন্ট অয়েল এর একটা প্রধান বৈশিষ্ট হল Viscosity যেটা আবার "তাপমাত্রার" সাথে পরিবর্তিত হয়। তাহলে একই অয়েল যদি দুবাই এবং জার্মানি তে ব্যবহার করা হয় তাহলে তো পারফর্মেন্স অনেক উঠানামা করবে। তাইনা?
তাই তাপমাত্রার সাথে Viscosity এর পরিবর্তন উপর নির্ভর করে একটা নাম দেয়া হয়।
যেমন: SAE-5, SAE-10, SAE-30, SAE-60 etc.
SAE যত বেশি তার Viscosity ও তত বেশি ।
এখন শীতের দেশের জন্য আবার অন্য একটা গ্রেড আছে যেটা আমাদের দেশে ও available।
সেটা হল SAE এর পরে একটা W যোগ করা ।
যেমনঃ SAE 10W, SAE 20W, SAE 20W
SAE 10W মানে হল এর Viscosity -20 ডিগ্রি তে 3500 cP এবং ম্যাক্সিমাম -25 ডিগ্রি তে এটা কে SAE-10 এর মত স্পিডে Pump করা যাবে, এর নিচে গেলে আর পাম্প করা যাবে না।
বিভিন্ন কোয়ালিটি এবং বিভিন্ন গ্রেডের জন্য নিচের ইনফরমেশন থেকে জানা যায় ওই গ্রেড বা ওই ইঞ্জিন অয়েল উক্ত তাপমাত্রার নিচে কাজ করে না:
0° C(32° F) – 5W-20, 5W-30, 10W-30,10W-40,20W-50
-18° C (0° F) – 5W-20, 5W-30, 10W-30, 10W-40.
BELOW -18° C (0° F) – 5W-20, 5W-30.
এখন যদি একটা গাড়ি চালাতে চালাতে দুবাই থেকে জার্মানি তে চলে আসে তাহলে কি হবে? এই কথা চিন্তা করে একটা মাল্টি গ্রেডের লুব্রিকেন্ট তৈরি করা হয় এবং অধিকাংশ গাড়ির কোম্পানি এই মাল্টি গ্রেডের লুব্রিকেন্ট রিকমান্ড করে।
যেমন: SAE 10W30, মানে এটা SAE 10W থেকে SAE 30 পর্যন্ত গ্রেড সাপোর্ট করবে।
এর আগে যেটা ছিল ওটাকে মনো গ্রেড লুব্রিকেন্ট বলা হত যেটা সাধারনত মেরিন ইঞ্জিন বা পাওয়ার প্লান্টের ইঞ্জিনে ব্যবহৃত হয়। মনো গ্রেডের দাম ও মাল্টি গ্রেডের থেকে কম হয়।
আপাতত বেসিক টেকনিক্যাল অংশ এইটুকু, অনেক কিছু বাদ দিতে হয়েছে কারন বেশি লিখলে অনেক কনফিউশন তৈরি হতে পারে কিন্তু আশা করি যতটুক লেখা হয়েছে এইটুক বুঝতে পারলেও অনেক।
মানুষ মাত্র ভুল হয়। এই লেখায় আমারও ভুল থাকতে পারে। কোথাও ঝামেলা মনে হলে দয়া করে বলবেন। আপনাদের প্রিয় যানটি দীর্ঘদিন ভাল পারফরমেন্স দিক। আপনাদের যাত্রা নিরাপদ হোক৷ এই দোয়া রইল। ধন্যবাদ সবাইকে।
(সংগৃহীত)