24/05/2026
জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কেন্দ্র... আরাফা।
খুব ভয় লাগছিল ৭ই জিলহাজ। তাবুতে চলে যাবার জন্য হোটেলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, হজের নিয়মের বইটা দেখছিলাম। আগে যেমন পরীক্ষার আগের রাতে টেনশন নিয়ে পড়তাম সে রকমই মনে হচ্ছিল।জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা স্থলে যাচ্ছি।
নবীজি বলেছেন আরাফাতের দিনের দোয়াই সর্বোত্তম দোয়া কিন্তু সেদিন অনেক হাজীগণ দোয়ায় গাফিলতি করেন। পরীক্ষা কেন্দ্রে যখন আমরা পরীক্ষা দিতাম আমরা কিন্তু আশেপাশের চেয়ার টেবিল, টিচার কি ড্রেস পরল, পাশের রুমে কি হচ্ছে সেসব নিয়ে চিন্তিত থাকতাম না অথচ আরাফায় অবস্থানকালে শয়তানের ওয়াস ওয়াসা আর নফসের ধোঁকায় অনেকেই খাবার নিয়ে হুড়াহুড়ি /ঝগড়া/ঘুমিয়ে/ কথা বলে/ বাথরুমে গোসল করার লাইন ধরতে ব্যস্ত থাকেন। দুয়া করাটা যে একটা ইবাদাত, যে কারণে আরাফায় আসা এটাই অনেকে ভুলে যান। অনেকেই দুয়া লিস্ট তৈরি করে আনে না যেখানে উচিত যেন টানা তিন চার ঘন্টা দোয়া করা যায় এরকম এক্সটেনসিভ দুয়ালিস্ট তৈরি করা। নিজের দোয়া নিজে লেখা অথবা হিসনুল মুসলিম/ যেকোনো ভালো দুয়ার বই থেকে দুয়া করা। জীবনের কোন দোয়া যেন বাদ না যায়। নিজের জন্য, নিজের সমস্ত পরিচিতজনদের জন্য, দেশের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য, অমুসলিমদের হেদায়েতের জন্য। অনুপস্থিত ভাই-বোনদের জন্য দোয়া করলে ফেরেশতারাও তার সাথে আমিন বলেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, "শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া এবং আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীরা সর্বোত্তম যে দোয়াটি পড়েছি তা হলো-"লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।"
অনেকে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করার পরিবর্তে জাবালে আরাফার দিকে মুখ করে দোয়া করাকে বেশি ফজিলতপূর্ণ মনে করেন এবং জাবালে আরাফায় যাওয়া এবং তার উপর উঠাকে অনেক সোয়াবের মনে করেন। আরেকটি বড় ভুল হচ্ছে একাকী দোয়া না করে কারো পিছনে মোনাজাত ধরে দোয়া করাকে অনেকেই পছন্দ করেন। কিন্তু সুন্নাহ হচ্ছে আরাফার ময়দানে লম্বা সময় একাকী দোয়া করা। কারণ নবীজি এটা করেছেন। বিদায় হজের দিন জোহরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নবীজি (সা.) তাঁর উটনীতে বসা অবস্থায়/ দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে অত্যন্ত বিনীতভাবে এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন।
নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, "সর্বোত্তম আমল কোনটি?" তিনি বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনা।" জিজ্ঞেস করা হলো, "এরপর কোনটি?" তিনি বললেন, "আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ।" এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, "তারপর কোনটি?" তিনি বললেন, "মাবরুর (কবুল হওয়া) হজ।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। সুসংবাদ তাদের জন্য যারা হজেও আছেন আবার জিহাদেও আছেন। হজ বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল এবং নারীদের জন্য জিহাদ।
আরাফার দিনের প্রধান কাজগুলো হচ্ছে হজের খুতবা শোনা, জোহর এবং আসরের সালাত কসর-জমা করে আদায় করা এবং তারপর বাকি সময় দোয়ায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়া, বেশি বেশি তালবিয়া পড়া। "আরাফাহ দিবসের তুলনায় এমন কোন দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তাআলা সর্বাধিক লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহ তা'আলা নিকটবর্তী হন, অতঃপর বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গৌরব প্রকাশ করেন এবং বলেন, তারা কি চায়?" (সহীহ মুসলিম) আরাফাতে অবস্থানকারীদেরকে সেদিন মরুভূমির বালুকণার পরিমাণ, দুনিয়ার সকল দিনের সমান অথবা আকাশের বৃষ্টির ফোটার সংখ্যার সমান গুনাহ ও আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক)। আরাফাতে আগমনকারীদের জন্য এ ক্ষমা প্রদর্শন কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।(তারগীব)
*আরাফার তাবুতে এসে নিশ্চিত হয়ে নেবেন আপনাদেরকে খুতবা শোনানো হবে কিনা।স্পিকারে খুতবা শোনার ব্যবস্থা আছে কিনা। ব্যবস্থা না থাকলে ফোনে শুনে নিবেন। ঘুমাতে চাইলে জোহরের আগের সময় রেস্ট নিয়ে নিবেন। জোহরের পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করবেন না। সম্ভব হলে তাবুর বাইরে চলে যাওয়া ভালো কারণ আকাশের দিকে তাকিয়ে দু হাত তুলে দোয়া করা সুন্নাহ। একটু পরপরই তাবুতে বিভিন্ন রকম খাবার আসতে থাকে। সে খাবার পাবার জন্য হুরাহুরি করা ঠিক না। জীবনে অনেক খাবার আমরা খেয়েছি একটা দিন একটু কম খেয়ে থাকি না। আরাফার দিনে গোসল করাটা খুব বেশি জরুরী না।গোসল করতে যেয়ে টয়লেট কে সাগর বানিয়ে অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া ঠিক না। অনেকেই মনে করেন জাবালে আরাফাই হচ্ছে আরাফার ময়দান। বলতে শোনা যায় যে আমাদেরকে কখন আরাফায় নেয়া হবে? আরাফার দিনে আরো বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে আরাফা মনে করে আরাফার ময়দানের বাহিরে কোনভাবেই অবস্থান করা যাবে না এবং সূর্যাস্তের পূর্বেই আরাফা ত্যাগ করা যাবে না। সব এজেন্সি গুলোকে সচেতন হতে হবে হাজীদেরকে বাধ্যতামূলক ট্রেনিং দেয়ার ব্যাপারে। আগে থেকেই জানা থাকলে হজ করা অনেক সহজ হয়ে যায়। অনেকে জানতে চান কিভাবে বুঝব কোন এজেন্সি ভালো? সে ক্ষেত্রে পূর্বের হাজীদের ফিডব্যাক নেয়া জরুরী। এজেন্সির ট্রেনিং ব্যবস্থা আছে কিনা, আকিদা সহিহ কিনা, ব্যবহার ভালো ছিল কিনা, কথা কাজের মিল ছিল কিনা ইত্যাদি।
এই একটা দিনের জন্যই কত স্বপ্ন, কত ত্যাগ, কত দোয়া....
ইয়া হাজ্জি আল্লাহ আপনাদের পরীক্ষা সফল করুন, হজকে কবুল করুন।