05/02/2018
প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে নির্মিত ১০৪টি আবাসিক হোটেল-কটেজের কাঠামো সরিয়ে নিতে নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে নির্দেশনা ছিল উচ্চ আদালতের। ২০১৭ সালের ১ মে দেওয়া নোটিশে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় পরবর্তী ১০ দিন। অথচ গত আট মাসে একটি হোটেলও অপসারণ করা হয়নি। উল্টো এসব হোটেলে এখন বাড়ানো হচ্ছে নতুন কক্ষ।
দুই মাস ধরে ৩০ থেকে ৩৫টি হোটেলের কলেবর বাড়ানোর কাজ চলছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। হোটেল মালিকদের দাবি, হোটেল অপসারণ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে প্রায় সাত বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের আওতাধীন। এটি দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ। এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সরকার সেন্ট মার্টিনকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র ও প্রবালের অন্যতম আধার এই দ্বীপে কংক্রিটের তৈরি অবকাঠামো নির্মাণও নিষিদ্ধ।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপরও সেখানে নতুন করে স্থাপনা তৈরি হচ্ছে খবর পেয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন তিনি। এতে অবৈধ হোটেলেই কক্ষ বাড়ানোর সত্যতা পান। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে দেখা গেছে, সৈকত ঘেঁষেই তৈরি হয়েছে ‘লাবিবা রিসোর্ট’ নামের একটি হোটেল। এটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলা আগেই তৈরি হয়েছিল। এখন তৃতীয় তলার ছাদে কাজ চলছে। প্রথম ও দ্বিতীয় তলার ৩৮টি কক্ষে ভাড়ায় থাকছেন পর্যটকেরা। তৃতীয় তলায় ১৩ জন শ্রমিক ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চালাচ্ছেন।
ছাদ ঢালাইয়ের কাজ তদারক করছেন মো. রফিক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, তৃতীয় তলায় আপাতত আটটি কক্ষ হবে। হোটেল নির্মাণের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) থেকে নকশার অনুমোদন নেই বলে স্বীকার করেন তিনি।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে হোটেলের কক্ষ বাড়ানো প্রসঙ্গে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম বলেন, জমি কিনেই তাঁরা হোটেল তৈরি করেছেন। শুধু তাঁরা কেন, সেন্ট মার্টিনের আরও শতাধিক হোটেলেরও অনুমোদন নেই।
দ্বীপের ডেইলপাড়ায় রাস্তার পাশে তৈরি হয়েছে আরেকটি ভবন। ভবনটির চতুর্থ তলায় ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করছেন ২৫ জন শ্রমিক। তিনতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হলেও এটি এখনো চালু হয়নি। এই হোটেলের শ্রমিকেরা বলেন, হোটেলের মালিক ঢাকার আবু জাফর। পুরো ভবন নির্মিত হলে এটি চালু হবে।
এই ভবনটির উত্তর ও পশ্চিম অংশে ছোট-বড় আরও ৩০টির মতো হোটেলের কলেবর বাড়ানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব প্রথম আলোকে বলেন, ২ জানুয়ারি তিনি সেন্ট মার্টিন গিয়ে নির্মাণাধীন চারটি বহুতল ভবনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হোটেল ও কটেজের কলেবর বৃদ্ধির নির্মাণকাজ চলা আরও ২৭টি হোটেলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। এর মধ্যে চারজন নোটিশের জবাবে কলেবর বাড়ানোর কথা অস্বীকার করেছেন। বাকিরা জবাব দেননি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হয়নি।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, টেকনাফ থেকে এই দ্বীপে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড পরিবহন নিষিদ্ধ থাকলেও বহিরাগত প্রভাবশালীরা জাহাজে করে এসব এনে বহুতল ভবন তৈরি করছেন। অনেকে দ্বীপের প্রাকৃতিক পাথর তুলে কাজে লাগাচ্ছেন। বাধা দিয়েও নির্মাণকাজ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর হাইকোর্ট সেন্ট মার্টিনে ছাড়পত্রবিহীন স্থাপনা অপসারণের আদেশ দেন। একই সঙ্গে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করা ও বিরল প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণেরও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২০১৭ সালের ২১ মার্চ হাইকোর্ট সেন্ট মার্টিনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নতুন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে ব্যর্থতার জন্য চার সচিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর সেন্ট মার্টিনের ১০৪টি হোটেল সরিয়ে নিতে নোটিশ পাঠায়। ১০৪টি হোটেলের মধ্যে ছিল একতলা ১৮টি, দোতলা ১৭টি, তিনতলা ৩টি ও কটেজ ৬৬টি। নোটিশে ২০১৭ সালের ১০ মের মধ্যে নিজ দায়িত্বে স্থাপনা সরানোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
সেন্ট মার্টিন হোটেল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিবলুল আজম কোরাইশী বলেন, হোটেলের মালিকেরা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আদালত গত ডিসেম্বর মাসে আদেশের ওপর ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। এই অবস্থায় স্থাপনা অপসারণ কিংবা বাড়ানো কোনোটাই করা যাবে না। এরপর কিছু হোটেলের মালিক কক্ষ বাড়ানোর কাজ করছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি প্রতিবেদন আকারে উচ্চ আদালতে উপস্থাপন করা হবে। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক করা হবে পরবর্তী করণীয়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এখন পর্যটনের মৌসুমে প্রতিদিন ৮টি জাহাজ ও ৬০টির বেশি কাঠের ট্রলারে চড়ে দৈনিক ৭ থেকে ৮ হাজার পর্যটক যাচ্ছেন সেন্ট মার্টিনে। এ ছাড়া দ্বীপের ১ হাজার ৩৫৪ পরিবারের সাড়ে ৮ হাজার বাসিন্দা রয়েছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের চাপ দ্বীপের প্রকৃতি-পরিবেশ ঝুঁকিতে ফেলছে।
প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে নির্মিত ১০৪টি আবাসিক হোটেল-কটেজের কাঠামো সরিয়ে ন...