06/05/2026
ফরেনসিকের ডায়েরী
----------------------------------------------------------
সময়টা ২০২৩ সালের উইন্টার ভ্যাকেশনের আগ মূহুর্ত। । সরকারী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ জার্নির সবে মাত্র 1st prof শেষ করেছি। মেডিকেল শাস্ত্রের প্রাথমিক জ্ঞান অ্যানাটমি, ফিজিওলজির মতো সাবজেক্ট গুলোর ট্রমা কাটাতে না কাটাতেই, এলো আরেক কঠিন সাবজেক্ট ফরেনসিক মেডিসিন। ফরেনসিক মেডিসিনের অন্যতম বিশেষ অনুষঙ্গ "ময়নাতদন্ত "। ময়নাতদন্ত সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনে ডাঃ তাহমিনা ম্যামের নির্দেশনায় ব্যাচের সবাই মিলে প্রথমবারের মত মর্গে গিয়েছিলাম।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মর্গে সেই দিনটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে উৎকন্ঠিত দিন। বাইরে হালকা রোদ, ভেতরে ঘন নীরবতা। ময়নাতদন্তের ঘরে ঢোকার সাথে সাথে শরীরের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। সেদিনের লাশটি এক সাংবাদিকের। সে আত্মহত্যা করেছে।
চোখে কালো চশমা পরে থেকেও ডেমো না হতে চাওয়া আমাদের, এক সময় তাকিয়ে থাকি সেই শরীরটির দিকে, যেটির বুক একটু পরেই ছেদ করা হবে, যেটি কেবল "মামলার নম্বর" হয়ে গেছে।
ময়নাতদন্ত শুরু হয়। স্ক্যালপেল হাতে ফরমালিনের গন্ধের মধ্যে ডোমের ছুরি চলে বুক থেকে পেটের দিকে। চামড়ার নিচের চর্বি, পাঁজরের ভাঙা হাড়, কালচে ফুসফুস, থেমে যাওয়া হৃদয়—আমাদের GHMC এর ডাঃ তাহমিনা ম্যাম (বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক বিভাগ) এবং DMC এর ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের এক ম্যামের নির্দেশনায় সব অঙ্গ - প্রতঙ্গ খুলে দেখানো হয় আমাদের মতো ছাত্রদের জন্য। যেন এই লাশ, যে কাল জীবিত মানুষ ছিল, আজ একটি "শিখন সামগ্রী" মাত্র।
আমি তাকিয়ে থাকি নিঃশব্দে। ভাবি—যে মানুষটা হয়তো শেষ রাতে অনেক কান্না করেছে, যার আত্মহত্যার পেছনে ছিল চাপা কষ্ট, আজ তাকে ঠান্ডা মেঝেতে ফেলে তার বুক খোলা হচ্ছে—নির্মমভাবে, নিঃসংকোচে। মৃত্যুর পর এমন কাটা ছেঁড়ার সম্মান হয়তো কোনো মানুষ চায় না। অথচ সে-ই শেষ মুহূর্তে ভেবেছিল, “মরে গেলে সব শেষ!”
না, কিছুই শেষ হয় না। বরং শুরু হয় এক নির্মম উন্মোচন,নিজেকে খোলা বই বানানোর যন্ত্রণা।
যা বোঝার ছিলঃ
- আত্মহত্যা কোনো মুক্তি না, এটা শরীরের উপর চালানো সবচেয়ে কঠিন ছুরি চালানোর কারণ হয়ে যায়।
- আত্মহত্যা করলে শান্তি মেলে না। ময়নাতদন্তের টেবিলে এক্সপোজার আর অপমানই বরণ করতে হয়।
- যারা যায়, তারা বাঁচতে চায় কিন্তু শেষ সময়টায় পাশে কেউ না থাকায় তারা “মৃত্যু” বেছে নেয়।
---
আত্মহত্যাকে না বলুন। কারও সঙ্গে কথা বলুন। লিখে ফেলুন কষ্টগুলো। কাউকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলুন।
কারণ মর্গে দাঁড়িয়ে যখন একজন মানুষের শরীর ছিঁড়ে ফেলা হয়, তখন বোঝা যায়,মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর কিছু আছে। মৃত্যুর পরের এই নীরব অপমান।