06/03/2025
#সিলেটের_নতুন_প্রজন্ম_কি_জানেন_কে_ছিলেন_কাপ্তান_মিয়া?
সিলেটের ইতিহাসে যেসব মহান ব্যক্তিত্ব অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে মৌলভী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ, যিনি কাপ্তান মিয়া নামে সমধিক পরিচিত, অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, উদ্যোক্তা এবং সমাজ সংস্কারক। কিন্তু আজকের নতুন প্রজন্ম কি জানেন কে ছিলেন এই কাপ্তান মিয়া? তাঁর অবদান এবং জীবনকাহিনী কি আমাদের সবার জানা উচিত নয়?
# # # প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
কাপ্তান মিয়া ১৮৭২ সালে সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আবদুল জলিল এবং দাদা সৈয়দ মুহিবুল্লাহ ছিলেন ইসলাম প্রচারক মৌলভীবাজারের সূফি সাধক শাহ মোস্তফার বংশধর। কাপ্তান মিয়ার শৈশব কাটে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পরিবেশে, যেখানে তিনি ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় গড়ে ওঠেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দু ভাষায় দক্ষ ছিলেন। সিলেটের নবাব তালেব বেঙ্গল স্কুল এবং সিলেট জেলা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। ১৮৯২ সালে তিনি বিএ (অনার্স) এবং ১৮৯৪ সালে বিএল (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন।
# # # কৃষি ও চা শিল্পে অবদান
কাপ্তান মিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল কৃষি ও চা শিল্পের উন্নয়নে। তিনি ১৯১১ সালে অল ইন্ডিয়া চা অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং সিলেট অঞ্চলে তিনটি চা বাগান গড়ে তোলেন। তাঁর এই উদ্যোগ সিলেটের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল। তিনি শুধু চা বাগানের মালিকই ছিলেন না, বরং কৃষি খামার এবং তেল কারখানারও মালিক ছিলেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ড তাকে আসামের প্রথম আদিবাসী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
# # # শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার
কাপ্তান মিয়া শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই অবদান রাখেননি, তিনি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯১২ সালে তিনি সিলেটে মুসলিম ইনস্টিটিউট হল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে শহীদ সুলেমান হল নামে পরিচিত। তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় মুরারিচাঁদ কলেজের মর্যাদা প্রথম গ্রেড ডিগ্রি স্তরে উন্নীত হয়। তিনি মুসলিম সমাজের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের উন্নয়নেও কাজ করেছেন। ১৯১৯ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সিলেটে আমন্ত্রণ জানান, যা সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।
# # # রাজনৈতিক জীবন
কাপ্তান মিয়া রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মোহামেডান শিক্ষা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন, যা নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি আসামের প্রথম স্থানীয় ও মুসলিম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২০ সালে তিনি সিলেট-বেঙ্গল রিইউনিয়ন লিগের নেতা হিসেবে সিলেট ও কাছারকে বাংলায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন করেন।
# # # সম্মান ও পুরস্কার
কাপ্তান মিয়ার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯১৫ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯২২ সালে তিনি ভারতীয় সাম্রাজ্যের কমপিয়ন অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার (সিআইই) সম্মাননা লাভ করেন।
# # # মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯২২ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে শিলংয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজারের ঠিক ডান পাশে মাজার কম্পাউন্ডের বাহিরের কবরস্থানে টাকে দাফন করা হয়। তার কন্যা পুত্র আবু সালেহ চৌধুরী তাঁর জীবনী লিখে রেখে গেছেন। কাপ্তান মিয়ার জীবন ও কর্ম আজও সিলেটবাসীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
# # # নতুন প্রজন্মের জন্য বার্তা
কাপ্তান মিয়ার জীবনী শুধু একটি ইতিহাস নয়, এটি আমাদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা। তিনি শুধু নিজের উন্নয়নেই নিবেদিত ছিলেন না, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের উন্নয়নে কাজ করেছেন। আজকের নতুন প্রজন্মের উচিত তাঁর জীবন ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। সিলেটের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আমরা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।
কাপ্তান মিয়ার মতো মহান ব্যক্তিত্বের জীবনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রশ্ন রেখে যাই—আমরা কি কাপ্তান মিয়ার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত?
মোঃ সামছুল হোসেন
সিনিয়র শিক্ষক