28/05/2026
আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দা ইবরাহিম (আঃ)-কে বার্ধক্যের এক সময়ে এমন এক উপত্যকায় দাঁড় করিয়েছিলেন, যেখানে জীবনের কোনো চিহ্নই ছিল না। চারদিকে শুধু তপ্ত বালু, দিগন্তজোড়া নির্জনতা, আ’গুন ঝরানো সূর্য আর গভীর নীরবতা। না ছিল পানি, না ছিল ফসল আর না ছিল মানুষের বসতি। যেখানে পাখিরাও থামত না, সেই নির্জন মরুভূমিতেই আল্লাহ তাঁকে বললেন-
“আমার ঘর নির্মাণ করো।”
একজন সাধারণ মানুষ হলে হয়তো প্রশ্ন করত—
“এখানে কে আসবে?”
“এই শূন্য উপত্যকায় আল্লাহর ইবাদত করবে কে?”
কিন্তু ইবরাহিম (আঃ) প্রশ্ন করেননি।
কারণ তিনি জানতেন, আল্লাহর আদেশের পেছনে এমন হিকমাহ থাকে, যা মানুষ সবসময় বুঝতে পারে না।
তিনি তাঁর ছোট্ট ছেলে ইসমাঈল (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে পাথরের পর পাথর তুলে গড়ে তুললেন কাবাঘর।
তপ্ত বালুর উপর দাঁড়িয়ে বাবা-ছেলে ঘাম ঝরাচ্ছেন, ক্লান্ত শরীর নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, আর তাঁদের ঠোঁটে কেবল একটি দোয়া—
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّآ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ
“হে আমাদের রব, আমাদের এই সামান্য আমল কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
কাবা নির্মাণ শেষ হলে আল্লাহ বললেন-
“মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করো।”
ইবরাহিম (আঃ) চারদিকে তাকালেন।
শুধু নির্জন মরুভূমি।
কোনো মানুষ নেই, কোনো কাফেলা নেই, কোনো জনবসতি নেই।
তিনি বিনীত কণ্ঠে বললেন-
“হে আমার রব! এই জনমানবহীন উপত্যকায় আমার ডাক কে শুনবে?”
আল্লাহ বললেন-
“তুমি শুধু ডাক দাও, পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
তারপর সেই নির্জন উপত্যকায় দাঁড়িয়ে ইবরাহিম (আঃ) আহ্বান জানালেন-
“এসো তোমাদের রবের ঘরের দিকে।
এসো তাঁর ক্ষমার দিকে।
এসো তাঁর ভালোবাসার পথে।”
সেদিন হয়তো সেই শূন্য মরুভূমিতে তাঁরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। কিন্তু সেই ডাক আকাশ পেরিয়ে, শতাব্দী পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছেছিল।
আজ হাজার বছর পরও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বলে-
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”
“আমি হাজির, হে আল্লাহ… আমি হাজির…”
যে উপত্যকায় একদিন পানি ছিল না, আজ সেখানে জমজমের পানি অবিরাম প্রবাহিত। যেখানে ছিল নিঃসঙ্গতা, আজ সেখানে মানুষের কান্না, দোয়া আর তাওয়াফের ঢেউ।
এই হজের ইতিহাস শুধু কাবা নির্মাণের ইতিহাস নয়, এটা কুরবানির ইতিহাসও।
এই পথের প্রতিটি ধাপে ইবরাহিম (আঃ)-এর ত্যাগ মিশে আছে। তিনি আল্লাহর জন্য নিজের জন্মভূমি ছেড়েছেন।
আল্লাহর জন্য স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও শিশু ইসমাঈল (আঃ)-কে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে এসেছেন।
আর শেষ পরীক্ষায়-
আল্লাহর আদেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-কেও কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন।
একজন বৃদ্ধ পিতা, যার বার্ধক্যের একমাত্র অবলম্বন তাঁর সন্তান। সেই সন্তানকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করতে নিয়ে যাচ্ছেন। বুক ভেঙে যাচ্ছে, চোখ ভিজে উঠছে, তবু অন্তরে কোনো অভিযোগ নেই। কারণ তাঁর কাছে আল্লাহর ভালোবাসাই ছিল সবচেয়ে বড়।
আর ইসমাঈল (আঃ)?
তিনি বলেন- “হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
এমন আনুগত্য, এমন আত্মসমর্পণ, এমন ভালোবাসার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই আছে।
তখন আল্লাহ জানিয়ে দিলেন-
তিনি র/ক্ত চান না, তিনি চান বান্দার তাকওয়া, হৃদয়ের আনুগত্য আর এমন ভালোবাসা, যেখানে মানুষ নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে পারে।
আল্লাহর পথে কোনো ত্যাগ কখনো হারিয়ে যায় না। একজন বান্দার আন্তরিক ডাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ সাড়া দেয়।আর যে হৃদয় আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে জানে, আল্লাহ সেই হৃদয়কে কখনো শূন্য রাখেন না। আর সেকারনেই হয়তো হজের বেশীরভাগ রসমের সাথে জড়িয়ে আছে ইবরাহিম (আঃ) এর পরিবারের কোরবানি।
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে একবার হলেও তাঁর ঘর দেখার তাওফিক দেন। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পানি নিয়ে বলতে দেন-
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”
“আমি হাজির, হে আল্লাহ… আমি হাজির…”