04/09/2026
আজ জন্মাষ্টমী। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথিতে ফিরে দেখা বাঁকুড়ার কিছু কৃষ্ণ মন্দির। হাজার বছরের ইতিহাস, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং অনন্য স্থাপত্যকলার নিদর্শন বহন করছে বাঁকুড়া জেলার বৈষ্ণব তীর্থক্ষেত্রগুলি
১. শ্যামরায় মন্দির (বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া)
১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজা রঘুনাথ সিংহ নির্মিত এই শ্যামরায় মন্দিরটিকে বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যের ‘মুকুটের মণি’ বলা হয়। এটি একটি পঞ্চরত্ন কাঠামোর মন্দির, যার চূড়াগুলি এবং বাইরের দেওয়াল সম্পূর্ণভাবে টেরাকোটা শিল্পে সুশোভিত। মন্দিরের মূল বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানী। রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা, কংস বধ, ননী চুরি এবং কালীয়দমন লীলার যে শৈল্পিক চিত্রায়ণ এই মন্দিরের গায়ে খোদিত রয়েছে, তা দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ও ইতিহাসবিদকে মুগ্ধ করে
২. মদনমোহন মন্দির (বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া)
বাংলার মন্দির স্থাপত্যের কথা উঠলেই বাঁকুড়ার নাম শীর্ষে আসে। ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজা দুর্জন সিংহ দেবের আমলে তৈরি এই মদনমোহন মন্দিরটি পোড়ামাটির এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। একরত্ন স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই একতল মন্দিরে মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহ ‘মদনমোহন’ হিসেবে পূজিত হন। মন্দিরের দেওয়ালের ইট ও ফলকগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত এবং কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মল্ল রাজপরিবারের কুলদেবতা এই মদনমোহনকে ঘিরে আজও বিষ্ণুপুরে রাস ও রথযাত্রার মতো উৎসব বিশেষ মর্যাদার সাথে উদযাপিত হয়।
৩. ত্রিধারা মন্দির পাঁচমুড়া।
রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা, কীর্তন ও বৈষ্ণব ভাবধারার পাশাপাশি শিব ও কালীপূজার সমন্বয়ের কারণে মন্দিরটি ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। সেই থেকেই পাঁচমুড়ার এই মন্দিরকে অনেকে ‘দ্বিতীয় বৃন্দাবন’, ‘নব বৃন্দাবন’ বা ‘বাংলার বৃন্দাবন’ বলে থাকেন। প্রতিদিনই এখানে বহু ভক্ত ও পর্যটকের সমাগম হয়। মন্দিরে ভোগ-প্রসাদের ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্তমানে এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। পাঁচমুড়া মূলত বিখ্যাত তার টেরাকোটা শিল্প ও বাঁকুড়ার ঘোড়ার জন্য। সেই শিল্পগ্রামের বুকেই গড়ে উঠেছে ত্রিধারা মিলন মন্দির। মন্দিরটি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী ভজন দত্তের উদ্যোগে নির্মিত হয়। ১ জুলাই ২০২২, রথযাত্রার শুভদিনে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা/উদ্বোধন হয়।
‘ত্রিধারা’ নামের মধ্যেই মন্দিরটির বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে। এখানে বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত—এই তিন ধারার উপাসনার সমন্বয় ঘটেছে। মূল মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পাশাপাশি রয়েছে কালী মন্দির, মহাদেবের মন্দির এবং রাম-সীতা ও অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনাস্থল।
মন্দিরের স্থাপত্য ও অলংকরণেও পৌরাণিক কাহিনির নানা চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে—দশাবতার, সমুদ্র মন্থন, কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ, বৈকুণ্ঠধাম এবং শ্রীচৈতন্যের লীলার মতো বিষয় দেখা যায়।
Aniruddha Sarkar