01/06/2024
তুষার সাম্রাজ্যের উত্তর সিকিম ভ্রমণ❤
🔹লাচুং
গ্যাংটক থেকে খুব সকালে গাড়ি ছাড়বে উত্তর সিকিম অভিমুখে। উত্তর সিকিমের এই সফর সবটাই হয় সাধারণত প্যাকেজ ট্যুরের মাধ্যমে। অর্থাৎ গাড়ি, হোটেল, খাওয়াদাওয়া— সব মিলিয়ে মাথাপিছু একটা মূল্য ধার্য হবে। উত্তর সিকিমের যাত্রীদের অনুমতিপত্র সঙ্গে থাকাটা জরুরি। অনুমতি পাওয়া যায় গ্যাংটক থেকেই। ভোটার বা আধার কার্ডের ফটোকপি ও দু’কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে আবেদন করলে সহজেই মেলে এই অনুমতিপত্র। গ্যাংটকে যে হোটেলে রাত্রিবাস করবেন, সেখানে ডকুমেন্টগুলি জমা দিলে তারাই আনিয়ে দেবে এই অনুমতিপত্র। গ্যাংটকের যে কোনও পর্যটন সংস্থার অফিসে যোগাযোগ করলে তারাও এই অনুমতিপত্র পাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে।
ভোরবেলা গ্যাংটক থেকে যাত্রা শুরু করে তাশি ভিউ পয়েন্ট, কাবি, ফোদং, মংগন, সিংঘিক পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন চুংথাং। পথে পড়বে ফোদং গুম্ফা ও সেভেন সিস্টার্স ফল্স। ছবি তোলার জন্য কিছু সময় থামা যেতেই পারে এই দু’টি দ্রষ্টব্যের কাছে। চুংথাং জায়গাটি এই অঞ্চলে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। লাচুং থেকে বয়ে আসা লাচুং-চু (চু মানে নদী) ও লাচেন থেকে বয়ে আসা লাচেন-চু নদী দু’টি এখানেই মিশে, তিস্তা নাম নিয়ে বয়ে গিয়েছে নীচের দিকে। বিরাট এক সামরিক ছাউনি রয়েছে এখানে। আছে বেশ কিছু দোকানপাট ও হোটেলও।
চুংথাং থেকে ২২ কিলোমিটার, অর্থাৎ গ্যাংটক থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত লাচুং গ্রামে পৌঁছনোর পথে সারাক্ষণ সঙ্গ দেবে লাচুং-চু। ৮৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লাচুং গ্রামটি বেশ সমৃদ্ধ। মূলত লাচুং-পা সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন এখানে। উঁচু পাহাড়ে ঘেরা নিসর্গে শোভাবৃদ্ধি করে সুন্দরী ঝর্না। হাতে সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন লাচুং গ্রামের কার্পেট বুনন কেন্দ্র (সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত খোলা থাকে) আর লাচুং গুম্ফা। অনেক সুন্দর ম্যুরাল ও প্রাচীন মূর্তি নজর কাড়বে এই গুম্ফায়।
🔹ইয়ুমথাং
১১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ইউমথাং-এর আর এক নাম হল ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার’। এপ্রিল-মে মাসে এখানে যেন জলসা বসে যায় ফুলের। বিভিন্ন প্রজাতির রডোডেনড্রন, প্রিমুলা ও আরও নানা ধরনের ফুলের সমারোহে তখন সত্যিই নন্দনকানন হয়ে ওঠে এই উপত্যকা। শীতকালে এলে (ডিসেম্বর থেকে মার্চ) আবার এই উপত্যকাকেই দেখতে পাবেন এক অন্য রূপে। বরফের সাদা পোশাকে তখন আবৃত থাকে পুরো ইয়ুমথাং অঞ্চল। মনে হবে বুঝি তুষার সাম্রাজ্যেই এসে পড়েছি। উঁচু পাহাড়ের সারি, উপত্যকা, রাস্তাঘাট— সবই সে সময় ঢাকা থাকে পুরু বরফের আস্তরণে।
লাচুং থেকে ইয়ুমথাং ২৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। সবুজ উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে উচ্ছ্বল নীলরঙা নদী। উপত্যকার শুরুতেই রয়েছে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ। বহু মানুষকে দেখবেন জলে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকতে। বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগের নাকি নিরাময় হয় এই জলে, এমনটাই শোনা যায়। সবুজ বিস্তীর্ণ উপত্যকার দু’দিকে বিস্তৃত উঁচু পাহাড়ের প্রাচীর। উপত্যকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে, সবুজ ঘাসের কার্পেটের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে এ বারে পৌঁছে যান শিবমন্দির হয়ে ইয়ুমেসামডং। দূরত্ব ইয়ুমথাং থেকে ২৩ কিলোমিটার। এই অবধিই যাওয়ার অনুমতি মেলে পর্যটকদের। চিন সীমান্তের নৈকট্যের কারণে প্রতিরক্ষা বিভাগের নির্দেশে এখানেই যাত্রাপথের ইতি টানতে হয়। ১৫০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ইয়ুমেসামডং এক অপূর্ব সুন্দর জায়গা। তুষারাবৃত ইয়ুমেসামডং-এর প্রাকৃতিক শোভা দেখে মুগ্ধতায় আবিষ্ট হন পর্যটকেরা। একই পথে ফিরে আসতে হবে লাচুং-এ। হাতে সময় থাকলে ও ফৌজি অনুমতি পেলে লাচুং থেকে নদীর উপর সেতু অতিক্রম করে অন্য পথে যাওয়া যেতে পারে কাটাও। দূরত্ব লাচুং থেকে ২৪ কিলোমিটার। তুষারাবৃত কাটাও পৌঁছে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন পর্যটকের দল। শুরু হয়ে যায় বরফ নিয়ে খেলা। তবে চিন সীমান্ত খুবই কাছে হওয়ার কারণে এ পথে অনুমতি পাওয়াটা খুবই সমস্যাজনক হয়ে পড়ে বেশির ভাগ সময়ে।
🔹জিরো পয়েন্ট
ইউমেসামডং বা জিরো পয়েন্ট উত্তর সিকিমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য। এটি ইউমথাং উপত্যকা থেকে প্রায় 22 কিমি উত্তরে অবস্থিত। 15,400 ফুট উচ্চতায় জায়গাটি বেশিরভাগ সময় তুষারে ঢাকা থাকে। ইউয়েসামডং-এ এক ঘণ্টার গাড়ি চালানো একটি অভিজ্ঞতা। তুষার আচ্ছাদিত পর্বত এবং অস্থির উপত্যকার দৃশ্য আপনাকে বিস্মিত করবে। ইউমেসামডং হল চীন সীমান্তের কাছে সবুজ চারণ ক্ষেত্র সহ একটি উপত্যকা। আর কোনো রাস্তা নেই। জিরো পয়েন্টে উষ্ণ প্রস্রবণের সংখ্যা নেই। সবই সালফারে সমৃদ্ধ, নিরাময় ক্ষমতা সহ ঔষধি গুণসম্পন্ন। উচ্চ উচ্চতায় ইউমেসামডং বেশির ভাগ সময় তুষারে ঢাকা থাকে। তাই ভারি পশমী কাপড় সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইউমেসামডং থেকে ইউমথাং উপত্যকায় একটি ট্রেক রুটও রয়েছে। পথটি ট্রেকারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। ইউমেসামডং আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছে, তাই সংরক্ষিত এলাকার আওতায় আসে। বিদেশি নাগরিকদের জিরো পয়েন্টে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
🔹কাটাও
সিকিমের উত্তর অংশে অবস্থিত, রাজধানী গ্যাংটক থেকে প্রায় 144 কিলোমিটার এবং লাচুং থেকে 28 কিলোমিটার দূরে, মাউন্ট কাটাও রাজ্যের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে যা আপনি কল্পনা করতে পারেন।
কাতাও উপত্যকা ইন্দো চীন সীমান্তে 13,500 ফুট উচ্চতায় ডনকিলা পাহাড়ে অবস্থিত। কাতাও পর্বত থেকে, আপনি তুষার-ঢাকা শৃঙ্গের মনোরম দৃশ্য দেখতে পারেন এবং এই জায়গায় যাওয়ার মাঝপথে আপনি একটি অত্যাশ্চর্য জলপ্রপাতও দেখতে পাবেন। উপত্যকাটি পপি, প্রিমুলা এবং রডোডেনড্রনের মতো আকর্ষণীয় উদ্ভিদ দ্বারাও আচ্ছাদিত। মুগ্ধকর সৌন্দর্যে আশীর্বাদপ্রাপ্ত কাটাও প্রায়ই ভারতের সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিত।
যাইহোক, এই মহিমান্বিত চূড়াটি যে এলাকায় অবস্থিত সেখানে প্রবেশের জন্য সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। এই পরাবাস্তব পর্বত দর্শকদের একটি চমৎকার দৃশ্য প্রদান করে। এই গন্তব্যটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্যও একটি উপযুক্ত জায়গা কারণ শীতের মৌসুমে এখানে স্কিইং, স্নোবোর্ডিং, স্নো টিউবিং এবং স্টোন গ্রাইন্ডিংয়ের মতো খেলা উপভোগ করা যায়।
Pack N Go ....
KUNTAL SAIN
096472 45245