01/08/2025
কেউ তীর্থ দর্শন করে এলে পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে 'জাবর কাটতে' বলতেন।
বলতেন, "গরু যেমন পেট ভরে জাব খেয়ে নিশ্চিত হয়ে এক জায়গায় বসে সেই সব খাবার উগরে ভাল করে চিবোতে বা জাবর কাটতে থাকে; সেইরকম দেবস্থান, তীর্থস্থান দেখবার পর সেখানে যে সব পবিত্র ঈশ্বরীয় ভাব মনে ওঠে, সেই সব নিয়ে একান্তে বসে ভাবতে হয় ও তাইতে ডুবে যেতে হয়; দেখে এসেই সে সব মন থেকে তাড়িয়ে বিষয়ের রূপে-রসে মন দিতে নাই; তাহলে ঐ ঈশ্বরীয় ভাবগুলি মনে স্থায়ী দাগ ফেলে না। আবার ঈশ্বরীয় ভাব ভক্তিভরে হৃদয়ে পূর্ব হতে পোষণ না করে তীর্থাদিতে গেলে, বিশেষ ফল পাওয়া যায় না।"
তপোভূমির মাহাত্ম্য সম্বন্ধে তপস্যাচার্য্য শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, "যেখানে অনেক লোক অনেকদিন ধরে ঈশ্বরকে দেখবে বলে তপ-জপ, ধ্যান-ধারণা, প্রার্থনা-উপাসনা করছে, সেখানে তাঁর বিশেষ প্রকাশ নিশ্চয় আছে জানবে। তাদের ভক্তিতে সেখানে একটা ঈশ্বরীয় ভাবের জমাট বেঁধে গেছে। তাই সেখানে সহজেই ঈশ্বরীয় ভাবের উদ্দীপন হয় ও তাঁর দর্শন হয়। যুগ যুগান্তর থেকে কত সাধু ভক্ত, সিদ্ধপুরুষেরা এইসব তীর্থে ঈশ্বরকে দেখবে বলে এসেছে। অন্য সব বাসনা ছেড়ে তাঁকে প্রাণভরে ডেকেছে। সেইজন্য ঈশ্বর সব জায়গায় সমানভাবে থাকলেও এইসব স্থানে তাঁর বিশেষ প্রকাশ।
যেমন মাটি খুঁড়লে সব জায়গাতেই জল পাওয়া যায়, কিন্তু যেখানে পাতকো, ডোবা, পুকুর বা হ্রদ আছে, সেখানে আর জলের জন্য কুঁয়ো খুড়তে হয় না— যখনই ইচ্ছা জল পাওয়া যায়, সেইরকম!"
ঈশ্বর মানে শান্তি। ঈশ্বর মানে আনন্দ। যেখানে শান্তি সেখানেই ঈশ্বর। যেখানে আনন্দ সেখানেই ঈশ্বর। মনেই শান্তি, মনেই আনন্দ। মনের মাঝেই ঈশ্বর বিরাজিত। 'মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত'।
মন হল যেন একটা পরিবেশ। সেই পরিবেশ যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়, শান্ত-সুন্দর হয়, লতায়-পাতায় ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ হয়, হিংস্র জন্তু জানোয়ার মুক্ত হয়, তবেই প্রাণারাম তাতে আনন্দে বিহার করে। অন্যথায় তিনি সে মরুভূমি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন। শুদ্ধতা-পবিত্রতা-স্থিরতা, প্রেম-প্রীতি-মৈত্রী, ভাব-ভক্তি-ভালবাসা, অহিংসা-অক্রোধ-নিরহঙ্কার প্রভৃতি সাত্ত্বিকগুণে গুণান্বিত সেই পরিবেশ— যেখানে তিনি থাকেন, আছেনই।
সংসার পথে স্নেহ প্রেম ভালবাসা পেলে স্নেহ-প্রেম-ভালবাসা জাগে, ঘৃণা পেলে ঘৃণা...। মা নর্মদার পথে রয়েছে নিষ্কাম প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা।
তাই তো সাধক পরিক্রমা শেষে 'প্রেমী' হয়, অনেক দূর থেকে নর্মদার তটে এসে গাঁটের কড়ি খরচ করে নিষ্কাম 'শিব জ্ঞানে জীব সেবা'য় রত হয়।
পূজায় বসে 'গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরী সরস্বতী।/ নৰ্ম্মদে সিন্ধু-কাবেরী জলেস্মিন্ সন্নিধিংকুরু।' —মন্ত্র পাঠ করে জলশুদ্ধি করে নিতে হয়।
মন্ত্র মধ্যে উল্লেখিত গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী সাতটি নদীর সকলেই পুণ্যতোয়া এবং সকলেরই আবির্ভাব ঘটেছে ভারতে। নদীগুলির মধ্যে নর্মদা অন্যতমা।
বেশিরভাগ পুরাণে নর্মদাকেই সর্বোচ্চ মাহাত্ম্য দেওয়া হয়েছে।
স্কন্দপুরাণের রেবা খণ্ডে বলা আছে— সরস্বতীর জলে তিন দিন স্নানে, যমুনায় সপ্তাহান্ত স্নানে এবং গঙ্গায় সদ্য স্নানেই মানব পবিত্র হয়ে ওঠেন।
আর নর্মদাকে দর্শন মাত্রই লোক পূত - পবিত্র হয়ে যান।
পুরাণে গঙ্গা ও যমুনার চেয়েও নর্মদাকেই শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া হয়েছে।
গঙ্গা জ্ঞান প্রদান করেন। যমুনা প্রেম প্রদান করেন।
আর নর্মদা ভক্তি দিয়ে থাকেন।
একটি বিখ্যাত শ্লোকে আছে— 'গঙ্গা কঙ্খলে পুণ্যা, কুরুক্ষেত্রে সরস্বতী।/ গ্রামে বা যদি বারণ্যে, পুণ্যাঃ সর্বত্র নর্মদা।' —গঙ্গা কঙ্খলে পুণ্যা, কুরুক্ষেত্রে পুণ্যা সরস্বতী, কিন্তু গ্রামে কিংবা অরণ্যে সর্বত্রই নর্মদা পুণ্যদা।
সমস্ত ধর্মগ্রন্থেই নর্মদার প্রশস্তিতে ভরা রয়েছে— 'তাবদ গর্জন্তি তীর্থানি যাবদ্রেবা ন দৃশ্যতে।' —সব তীর্থের মহিমা কেবল তখন পর্যন্তই, যতক্ষণ না রেবার দর্শন হচ্ছে। রেবা নর্মদারই অপর নাম।
কলিযুগে পাপ নাশ করতে পারে একমাত্র নদী নর্মদা। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে নর্মদাই একমাত্র নদী, যেখানে পরিক্রমা করা হয়।
নর্মদার মহিমা বলে শেষ করা যায় না। মা নর্মদার স্মরণে এক জন্মার্জিত, দর্শনে তিন জন্মার্জিত আর স্নানে সাত জন্মের পাপ বিনষ্ট হয়। —এ কথা শাস্ত্রের।
মহাভারতের বনপর্বে আছে যুধিষ্ঠির তীর্থ ভ্রমণে বেরলে পুলস্ত্য মুনি আশীর্বাদ করে বললেন, যুধিষ্ঠির তুমি অন্যান্য তীর্থে তো যাবেই, পরন্তু বিশেষ করে ত্রিলোক প্রসিদ্ধা নর্মদাকে অতি অবশ্যই দর্শন করে আসবে।
হিমালয়ের সুউচ্চ ঝরণার রূপ-ধারা গভীরতা গম্ভীরতা ভীষণতা আনে। নর্মদা মায়ের সমতলের এ রূপ দর্শনে পরমানন্দ আনে। এ যে মায়ের রূপ!
মায়ের নিজের সৃষ্টিকৃত রূপ। 'রসো বৈ সঃ' —এর মায়ারস নিজেই সহস্ররূপে বিভক্ত হয়ে বহুরূপে নিজেকে প্রকাশ করেছেন— 'রূপং রূপং প্রতিরূপং বভূব'।
অনন্ত রূপের প্রকৃতি হয়ে রস স্বরূপকে নিজে পূজো করছেন।
ফুল ফুটিয়ে, ফল ঝুলিয়ে, বায়ু-চামর বুলিয়ে, সূর্যদীপ প্রজ্জ্বলিত করে, চন্দ্র-সান্ধ্য প্রদীপ জ্বালিয়ে-ঋতু-মাস-বৎসরের প্রতিটি দিনে-ক্ষণে নিয়ত করছেন তাঁর পুজো!
নর্মদায় পরিক্রমা এক মহা তপস্যা। এ যুগে এই তপস্যা প্রত্যক্ষ ফলপ্রদ। তাঁর সঙ্কল্পটুকু নিয়ে নর্মদা মাকে চিন্তন মনন করতে করতে নর্মদা পরিক্রমা করলে তাঁর মনোবাসনা পূর্ণ হবেই।
যার যা কিছুই পার্থিব বা পরমার্থ তৃষ্ণা থাকুক না কেন নর্মদা মা পরিতৃপ্তি দেবেনই।
বহু প্রাচীনকালে বৈদিক ঋষি অনীমাণ্ডব নর্মদার তটে তটে তপস্যা করেছেন। তিনি তপস্যাকারীদের উদ্দেশে জানিয়ে ছিলেন, যে নর্মদা তটে তপস্যা করবে, নর্মদার কৃপায় তার মোক্ষ লাভ হবে।
মা নর্মদার পাবনী শক্তির মহিমা এমনই যে, নর্মদার তীরে কেবল নর্মদা বা মায়ের অপর নাম রেবা জপ করলেই সবরকম অভীষ্ট সিদ্ধ হওয়া যায়।
নর্মদায় যেখানে অন্য নদীর সঙ্গম হয় সেখানে যদি জপ, তপ, স্নান, দান, হোম, বেদপাঠ, পিতৃ-পূজন, মনোবাসনা প্রার্থনা, ব্যাধিনাশ, নিমিত্ত দেব-আরাধনা, মন্ত্রোপদেশ, সন্ন্যাস, দেহত্যাগ ইত্যাদি যেকোনও ক্রিয়া অনুষ্ঠান করা যায় তার ফল সঙ্গে সঙ্গেই মিলবে।
এ ব্যাপারে আরও জানা যায় যে— বৈশাখ, মাঘ অথবা কার্তিকের পূর্ণিমাতে, বিষযোগে, সংক্রান্তিতে, ব্যতীপাত অথবা বৈধৃতি যোগে, অমাবস্যায়, তিথিহানি অথবা বৃদ্ধি দিবসে, মন্বাদি, যুগাদি আর কল্পাদি তিথি সমূহে মাতা-পিতার শ্রাদ্ধকালে নর্মদা তটবর্তী ওঙ্কারে, ভৃগুক্ষেত্রে, সিদ্ধক্ষেত্রে নেমাবরে অথবা বিশেষভাবে সঙ্গমে যে পুণ্যবান ব্যক্তি নর্মদায় স্নান, দান, জপ, হোম, পূজন প্রভৃতি করে থাকেন তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করেন।
ঋষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন— হে রাজন! মনুষ্য যেখানে যেখানে নর্মদার জলে স্নান করে থাকে সেই মানুষের সেখানেই অশ্বমেধ যজ্ঞের ফলপ্রাপ্তি ঘটে। আর যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে ঘুম ভেঙে উঠে নর্মদার স্মরণ, মনন তথা কীর্তন করে থাকে তার সাত জন্মের সমুদয় পাপ নর্মদার কৃপায় তৎক্ষণাৎ মোচন হয়ে যায়।
মা নর্মদার উৎপত্তির কাহিনি:—
সৃষ্টির আদিকল্পে মা নর্মদার উৎপত্তি। তাঁর উৎপত্তির কাহিনি স্কন্দপুরাণ, শিবপুরাণ, বায়ুপুরাণ এবং অন্যান্য পুরাণ গ্রন্থেও পাওয়া যায়। নর্মদার উৎপত্তি নিয়ে কোথাও কোথাও মতভেদ রয়েছে।
তাঁর নামকরণ নিয়েও পুরাণের কাহিনিগুলিতে মিল নেই। নর্মদার উৎপত্তি সম্বন্ধে বশিষ্ঠ-সংহিতা এবং মহাভারতেও উল্লেখ আছে। মা নর্মদার জন্মকথা ও মাহাত্ম্য মার্কণ্ডেয় ঋষির মুখে প্রথম শোনা গিয়েছিল। দ্বাপরে মহারাজ যুধিষ্ঠির বনগমন পর্বে বিভিন্ন মুনি-ঋষির আশ্রম পরিভ্রমণকালে বিন্ধ্য পর্বত শিখরে মহামুনি মার্কণ্ডেয়র আশ্রমেও প্রবেশ করেছিলেন।
পৃথিবীর সবথেকে দীর্ঘায়ু জীবিত ঋষির সাক্ষাৎ পেয়ে কোনও এক অবসরে যুধিষ্ঠির ঋষির চরণে প্রণত হয়ে প্রার্থনা করলে মহামুনি তখন কল্পে কল্পে বহমানা নিত্যা পুণ্যতোয়া মা নর্মদার কথা শোনালেন—
একবার মহাপ্রলয় অন্তে মহাদেব আর উমা নিখিল চরাচরের কল্যাণে ঋকশৈলে তথা বর্তমান বিন্ধ্যপর্বতে দুশ্চর তপস্যায় মগ্ন হয়েছিলেন।
উভয়ের তপস্যায় প্রথমে উমার শরীর বেয়ে সপ্তদশ স্বেদবিন্দু নেমে মহাদেবের পায়ের উপর পড়ে; ভিন্ন মতে শিবের ত্রিশূল বেয়ে সপ্তদশ বিন্দু স্বেদ শিবের পায়ে পড়েছিল। তারপর মহাদেবেরও শরীর থেকে ক্রমাগত স্বেদ বিন্দু ঝরে ওই সপ্তদশ স্বেদবিন্দুর সঙ্গে মিলে ঋকশৈল পর্বতকে প্লাবিত করে এক পুণ্য সলিলা নদীর রূপ পরিগ্রহ করে।
পরে সেই নদী এক অপরূপা সুন্দরী কন্যার রূপ ধারণ করে রুদ্রের আরাধনায় বসেন। বহু বছর ব্যাপী তিনি রুদ্রের কঠিন তপস্যায় লীন হয়েছিলেন।
তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে দর্শন দিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে তপস্বিনী বললেন, আমি রুদ্রের তেজ হতে উৎপন্না। শংকর তাতে আরও প্রসন্ন হয়ে বর দিতে চাইলেন। তিনি পিতার কাছে প্রার্থনা করলেন, আমি যেন চিরকাল আপনার সঙ্গে নিত্যযুক্তা হয়ে অবস্থান করি। নিজ কন্যার প্রার্থনা মঞ্জুর করে মহেশ্বর বললেন, তুমি আমার তপস্যার তেজ হতে উদ্ভুতা।
তাই তুমি শুধু আমার সঙ্গে নিত্যযুক্তা হয়েই থাকবে না, তুমি হবে পুণ্যতোয়া।
তোমার জলে অবগাহন করে পাতক কলুষ মুক্ত হবে। তুমি হবে নিত্যা, সর্বাসিদ্ধিদাত্রী এবং মহামোক্ষপ্রদায়িণী। সপ্তকল্প বর্ষেও তুমি বহমানা থাকবে।
কন্যার নর্মদা নামটিও পিতারই দেওয়া। নর্মদা শব্দের অর্থ যার কখনও মৃত্যু নেই।
যা প্রলয়কালেও লুপ্ত হয় না। জন্ম থেকেই অসামান্য সুন্দরী এই কন্যা অমরকণ্টকে বিচরণ করতেন। একটা সুন্দরী লাবণ্যময়ী মেয়েকে একা একা ঘুরতে দেখে দৈত্য, দানব এমনকী স্বর্গের দেবতারাও রূপে আকৃষ্ট হয়ে মেয়েটির পিছু নিলে, মেয়েটি জলরূপে পাহাড়, পর্বত, মাটি ও অরণ্য ফুঁড়ে ছুটে চললেন। দৌড়ে কারওরই তাঁকে ধরার সামর্থ্য নেই। নদীরূপে মেয়েটি সকলকে পেছনে ফেলে বর্তমান গুজরাতের ভারোচের কাছে খাম্বাত মোহনায় উপস্থিত হলেন। সেই মেয়ে সকলকে পরাজিত করলে শিব খুশিতে ডগমগিয়ে উঠলেন।
তিনি আপন কন্যাকে বললেন, তুমি আমার হৃদয়ে বড়ই আনন্দ-বিলাস ঘটালে।
এই দুই কারণেও তোমার নাম রাখলাম নর্মদা।
সংস্কৃতে 'নর্ম' শব্দের অর্থ হাসা ও খেলা, পরিতৃপ্ত বিধায়িণী, আনন্দ ও বিলাস ইত্যাদি। নর্মদা তখন আরব সাগরে লীন হলেন।
মেখল পাহাড়ে নর্মদার উৎস ও পথচলা:—
বিন্ধ্য পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে পুণ্যতীর্থ অমরকণ্টকের অবস্থান। অমরকণ্টকের অপর নাম ঋষ্য বা মেকল পাহাড়। এখানেই নর্মদার উৎসস্থল।
নর্মদা পশ্চিম-গামিনী হয়ে বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতমালার বুক চিরে মধ্যপ্রদেশের শাডোল, মান্দালা, নরসিংহপুর, নর্মদাপুর ও খাণ্ডোয়া অতিক্রম করে তথা মধ্যপ্রদেশসহ মহারাষ্ট্র ও গুজরাত —এই তিনটি রাজ্যকে আলিঙ্গনে বেঁধে প্রায় সাড়ে তেরোশো কিলোমিটার পথ ভেঙে গুজরাতের ভারোচে ও ভূগুকচ্ছে আরব সাগরে মিলেছে। নর্মদার তটে তটে নর্মদার গর্ভে শিবলিঙ্গের ছড়াছড়ি। স্বয়ং শিব আত্মজা নর্মদাকে বর দিয়েছিলেন। শিব বললেন— হে পুত্রী, তুমি জলময়ী শিবা। তুমি যেমন আমার পুত্রী, তেমনই আমিও তোমার পুত্র হয়ে তোমার কোলে নিত্যকাল ধরে বিরাজ করব।
কন্যাকে প্রাণ ঢালা আশীর্বাদ ও বর দিয়ে সেদিন থেকেই শিবশংকর নর্মদার নীল জলের মধ্যে প্রত্যেকটি পাথর, নুড়ি ও কাঁকর-কণা মধ্যে চিন্ময় শক্তি সম্পন্ন শিবলিঙ্গ রূপে ভেসে বেড়াচ্ছেন।
স্বয়ং মহাদেব নর্মদার তটে তটে পরিক্রমা করে নিজেকে যত্রতত্র প্রকট করেছেন।
যার ফলে নর্মদার উভয় তীরে ঘাটে ঘাটে অজস্র তীর্থ গড়ে উঠেছে। একমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ নদী নর্মদা যার দুই তটে শাস্ত্র বর্ণিত সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রায় ৮৮ হাজার তীর্থের অবস্থান।
মহামুনি মার্কণ্ডেয় বলেছেন নর্মদার তীরে কোটি তীর্থ বর্তমান।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে নর্মদার স্তোত্র নিত্য পাঠ করেন তিনি ব্রাহ্মণ হলে বেদযজ্ঞের অধিকারী হবেন। আর ক্ষত্রিয় কুলে জন্ম হয়ে থাকলে সর্বত্র বিজয়ী হয়ে থাকেন। বণিক বা বৈশ্য হলে ধনলাভ করবেন। আর শূদ্রের ঘরে জন্মে থাকলে তাঁর শুভ গতি হবে।
'নর্মদা সেবতে নিত্যম স্বয়ং দেবো মহেশ্বরোঃ।
তেন পুণ্যা নদী জ্ঞেয়া ব্রহ্ম হত্যাপহারিণী।।'
(মৎস্যপুরাণ, অধ্যায় ১৯০, শ্লোক ২৫)।
—সাক্ষাৎ মহেশ্বর নর্মদা নদীর জল নিত্য সেবন করেন। এই কারণে এই পবিত্র সলিলা ব্রহ্মহত্যা রূপ পাপেরও নিবারণ করতে সক্ষম।
মার্কণ্ডেয় মুনি বলেছেন— শুধু গঙ্গাধর মহেশ্বরদেব নন, তাঁর পত্নী তথা নারায়ণের পাদোদ্ভূতা মহাপুণ্য সলিলা সাক্ষাৎ গঙ্গামাতা —যাঁর জলে কৃতঘ্ন, বিশ্বাসঘাতক, ব্যাভিচারী, ব্রহ্মঘাতী, নরহত্যাকারী, ঘুষখোর, অগম্যগামী, মিথ্যাচারী, পিতৃমাতৃত্যাগী, গুরুনিন্দুক প্রভৃতি পাপিষ্ঠগণ নিত্য অবগাহন করে তাদের কৃত সকল পাপরূপ ক্ষার গঙ্গায় ঢেলে দিয়ে পাপমুক্ত হয়ে থাকে— সেই গঙ্গামাতাও পাপিষ্ঠগণের পাপ রূপ ক্ষারে দগ্ধ হওয়া থেকে ও তাদের স্পর্শের জ্বালা থেকে মন প্রাণ কর ও দেহকে জুড়াতে নিত্য মা নর্মদার জলে প্রবেশ করেন।
শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আপন ধ্যান দৃষ্টিতে দেখেছিলেন মা গঙ্গা কৃষ্ণগাভীর রূপ ধরে নর্মদায় স্নান করলেন এবং শ্বেতবর্ণ ধারণ করে অন্তর্হিতা হয়ে গেলেন। তাই নর্মদার চেয়ে পবিত্র আর কোনও নদী হয় না।
মহেশ্বর নিজে পরিক্রমা করে পরিক্রমার মাহাত্ম্য প্রচার করে গেছেন।
নর্মদা পরিক্রমার সূচনাকাল থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য মহা মহা মুনি, ঋষি, সাধু, সন্ত পরিক্রমা করেছেন। মৃত্যুঞ্জয় মহামন্ত্রের উদগাতা চিরঞ্জীবী মার্কণ্ডেয় ঋষি, চিরঞ্জীবী অশ্বথামা এঁরাও নর্মদা পরিক্রমায় অংশ নিয়েছেন।
নর্মদার তটে তপস্যা ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে বা প্রবাদ রয়েছে যে, এখানে সাক্ষাৎ শরীরে তপস্যারত ঋষি-মনির সংখ্যা অগণন।
আরও প্রবাদ যে, নর্মদার উভয় তট মিলিয়ে শুধুমাত্র সুক্ষ-শরীরে তপস্যারত উচ্চ কোটির সাধুদের সংখ্যা তারও কোটিগুণ।
অবস্থাটা এমনই যে অদৃশ্য অবস্থায় তাদের কমণ্ডলু থেকে কমণ্ডুল পাশাপাশি মিলে যেন জুড়ে থাকে, উপর থেকে তাদের লক্ষ করে তিল নীচে ফেলা হলে, সেই তিল মাটিতে না পড়ে তপস্বীদের শরীরে, জটায় বা কমণ্ডলুতে অনেকেই প্রতিদিনই অনেককে বিপদে-আপদে বা প্রার্থনায় গিয়ে পড়বে। তপস্যারত সূক্ষ্ম দেহধারী এইসব সিদ্ধ পুরুষদের সাক্ষাৎ দিয়ে থাকেন।
এঁদের কারণেই নর্মদা তটে আজও প্রতিনিয়ত অলৌকিক সাধ্য-সাধন হয়ে ওঠে।
নর্মদা পরিক্রমাকারীদের বিপদের অন্ত নেই। কিন্তু পরম আশ্চর্যের ব্যাপার নর্মদা মা প্রতিমুহূর্তে তাঁর পরিক্রমাকারী ও তীর্থসেবী সন্তানদের চোখে চোখ রেখে সকল বিপদ-আপদ থেকে তাঁদের রক্ষা করেন।
প্রত্যেকেরই প্রতিদিনের আহার, আশ্রয় ইত্যাদি জুগিয়ে যান। সন্তানদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে মা নর্মদাকে কখনও কখনও কোনও না কোনও রূপে তাঁদের সামনে প্রকট হয়েও পড়তে হয়। সিদ্ধ তপস্বীরাই তা অনুভব করতে পারেন।
পরিক্রমার মর্যাদা:—
নর্মদা পরিক্রমাকারী সকলেই ভৌতিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমান মর্যাদা পেয়ে থাকেন। ভৌতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমান কথার তাৎপর্য হল যে, নর্মদা পরিক্রমাকালে কেউই প্রয়োজনের বেশি ধনরাশি সঙ্গে রাখতে পারেন না।
এ ব্যাপারে কারওরই স্বতন্ত্রতা নেই। আধ্যাত্মিক তথা ধার্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে সকলের সমান মর্যাদা দেওয়ার কারণ হল যে, নর্মদা মায়ের কাছে পরিক্রমাবাসী সকল সন্তানই সমান।
নর্মদা পরিক্রমাকারী সকলেই মা নর্মদার কৃপায় কখনও কষ্ট অনুভব করেন না। বিপদে পড়লেও মা নর্মদাই পরিক্রমাবাসীদের উদ্ধার করেন।
সাধারণ দৃষ্টিতে বঙ্গদেশের বেশীরভাগ মানুষ “নর্মদা” শব্দে একটা নদীকে বোঝে। মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অমরকন্টক থেকে উদ্ভূত হয়ে ১২৮৯ কি.মি.পথ অতিক্রম করে গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত ভারুচ জেলার মিঠিতলাই নামক স্থানে আরব সাগরে বিলীন হয়েছে।
প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিদের দৃষ্টিতে অবশ্য নর্মদা নদীর জলরূপের অন্তরালে সমগ্র বিশ্ব চরাচর পরিব্যাপ্ত করে অখণ্ড চৈতন্য স্বরূপিণী এক দেবী বিরাজিতা রয়েছেন। এই দেবী স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের শরীর থেকে উৎপন্ন।
পরমেশ্বর শিব সর্বজনের কল্যানার্থে তাঁর কন্যা সরিৎশ্রেষ্ঠা মা নমদাকে মর্ত্যে অবতরণ করিয়েছেন। কলিযুগের সাক্ষাৎদেবী মা নর্মদার তীরে সেই সুপ্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে মুনি-ঋষিগণ তপস্যা করে চলেছেন এবং নর্মদাতট চিরকাল তপস্বীদের তপস্যার প্রভাবে পূত।
এখনও প্রচুর সাধু-সন্ত-মহাত্মা মা নর্মদার শরণাপন্ন হয়ে তাঁর জলপ্রবাহের পদব্রজে পরিক্রমা করেন।
এই পরিক্রমা শাস্ত্রবিধি মেনে একবার সম্পূর্ণ করতে পারলে মনুষ্য জীবন ধন্য হয়ে যায়।
এই পরিক্রমা একটা পূর্ণ তপস্যা যার নাম মহেশ্বর যোগ।
ব্যাকরণগত দিক থেকে নর্মদা শব্দের অর্থ হলো “নর্মং কল্যানং দদাতি ইতি নর্মদা” (নৃ + মনিন = নর্মন = নৰ্ম + দা = নর্মদা) অর্থাৎ যিনি সকলের কল্যানকারী ও সুখপ্রদাত্রী তিনিই নর্মদা।
নর্ম শব্দের অর্থ নম্র বা প্রসন্নতা এবং দা শব্দের অর্থ দাতা।
তাই যিনি সকলকে নম্রতা ও প্রসন্নতা প্রদান করেন তিনিই নর্মদা। এহেন মা নর্মদার জলপ্রবাহকে কেন্দ্র করে প্রাচীনকাল থেকে অজস্র মুনি-ঋষি ও তপস্বীদের নর্মদা তটে বসবাস এবং শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করে তাঁর অর্চনা।
এই কারণে বর্তমানে মা নর্মদার জলপ্রবাহের উভয় তটে অগণিত শিবলিঙ্গ দৃষ্ট হয়।
শিবপুরাণের জ্ঞানসংহিতায় আছে, “নর্মদা তীরে বহু শিবলিঙ্গ আছেন, তাঁর সংখ্যা নাই। সেই নর্মদা রুদ্রস্বরূপ হয়ে সকলের পাপ হরণ করে চলেছেন।”
পদব্রজে নর্মদা পরিক্রমার কঠোরতার তুলনায় গাড়ীতে পরিক্রমা বিলাসিতা, কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু সবাই পদব্রজে পরিক্রমার সামর্থ্যও রাখেন না, সময়েরও অভাব; তাই ক্রমান্বয়ে গাড়ীতে পরিক্রমা সাধারণ মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
শাস্ত্র বলছে, “নরযানং চ অশ্বতরী; হয়াদিসহিতো রথঃ।
তীর্থযাত্রা হি অশক্তানাং যানদোষকরী ন হি।।”
অর্থাৎ, অসমর্থ মানব পালকী, রথ ইত্যাদিতে তীর্থ পরিক্রমা করতে পারে; তা দোষকর নয়।
“পথ আমারে সেই দেখাবে, যে আমারে চায়। আমি অভয় মনে ছাড়বো তরী, এই শুধু মোর দায়” ভগবান নিজেই বিবিধ রূপে পথনির্দেশিকা দিয়ে দেবেন, যদি আমাদের লক্ষ্য ঠিক থাকে।
তাঁর দিকে কেউ এক পা অগ্রসর হলে, তিনি ১০০ পা ভক্তের দিকে এগিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তাই, পথ হারানোর চিন্তা নয়; পথে নামাটাই কাজ।
এমনি করে চলতে চলতে কোন এক দিন নিশ্চয় জীবনের “ভাঙ্গা পথের রাঙা ধুলায়” তাঁর শ্রীচরণ চিহ্ন ফুটে উঠবে।
“নর্মদা সরিতাং শ্রেষ্ঠা রুদ্রতেজাৎ বিনিসৃতা। তারয়েৎ সর্বভূতানি স্থাবরাণি চরাণি চ।।”
অর্থাৎ, নর্মদা নদীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা। তিনি রুদ্র অর্থাৎ শিবের তেজ থেকে উৎপন্না। তিনি স্থাবর-জঙ্গম সর্বভূতকে উদ্ধার করেন, অর্থাৎ মুক্তি দেন।
হিন্দুধর্মে যে সাতটি নদীকে সবচেয়ে পবিত্র মান্য করা হয় (গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী), তার মধ্যে শুধুমাত্র মা নর্মদাকেই পরিক্রমা করা হয়।
নর্মদা পরিক্রমা করার অর্থ নর্মদাকে (সাধারণ ভাবে) সর্বদা ডাইনে রেখে একটা পুরো চক্কর খাওয়া।
সেটা যে উৎস অর্থাৎ অমরকণ্টক থেকেই শুরু করতে হবে, তা কিন্তু নয়।
যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করে পুরো নর্মদাকে ঘুরে আবার সেই স্টার্টিং পয়েন্টে ফিরতে হবে। এর মধ্যে কোথাও কোনও কারণেই নর্মদাকে ক্রস করা যাবে না।
নর্মদা পরিক্রমা অত্যন্ত কঠিন। ঠিক নিয়ম মেনে করতে গেলে পায়ে হেঁটে (এর মধ্যে বর্ষাকালে তিন বা চারমাস হাঁটা বন্ধ থাকবে) তিনবছর তিনমাস তের দিন সময় লাগে।
নর্মদা পরিক্রমা কোনও লং ডিসট্যান্স রেস নয় যে যেন তেন প্রকারেণ নর্মদাকে একটা পাক খেয়ে ৮১৫x২ = ১৬৩০ মাইল ঘুরে এলাম।
এটি একটি সম্পূর্ণ তপস্যা।
আগে রাজা-মহারাজারা নাকি পালকি অথবা ঘোড়া বা গরুর গাড়িতে এই পরিক্রমা করতেন।
এরই আধুনিকতম রূপ হচ্ছে গাড়িতে নর্মদা পরিক্রমা করা।
আমি এই ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৪ গাড়িতে করে মা নর্মদা পরিক্রমা করলাম।
একটা খোঁজে গিয়েছিলাম। কী পেলাম, তা এত তাড়াতাড়ি বোঝা সম্ভব নয়। যা পেলাম, তার কিছুটা বলা যায়, কিছুটা অনুভবের যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও ছত্তিসগড় এই চারটি প্রদেশের বহু বহু জায়গা দেখলাম, বহু নদনদী জঙ্গল পাহাড় শহর গ্রাম ক্ষেত মন্দির দেবালয় দেবমূর্তি দেখলাম। সবার চেয়ে বেশি দেখলাম বহু রকমের মানুষজন।
আর কিছুটা হলেও চিনলাম ভারতবর্ষের চিরন্তন আত্মাকে।
চিরন্তন ভারতবর্ষকে দেখে এলাম। আর অনুভব করলাম নিজের ক্ষুদ্রত্ব।
আমার সহযাত্রী যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই উনিশ দিন সবাই একটা পরিবারের মতো একসাথে ছিলাম। অভিজ্ঞতা এক হলেও অনুভব নিশ্চয়ই সব সময় এক হয়নি।
মা নমর্দা আমার ইষ্টদেবী। গাড়িতে মা নর্মদার পরিক্রমাকালে আমি বহু তীর্থ দর্শন করলাম। কিছু কিছু শৈব তীর্থে প্রবেশ মাত্রই ঐ স্থানের উচ্চ আধ্যাত্মিক প্রভাব অনুভব করেছি।
স্বয়ং মহাদেব মা নমর্দা জলগর্ভে সর্বদা লিঙ্গরূপ ধারণ করে বিরাজিত থাকেন। সেসব শিবলিঙ্গ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে শিবভক্তদের গৃহদেবতা হিসাবে পূজিত হন। ভারতবর্ষের বেশীরভাগ মন্দিরে নর্মদেশ্বর মহাদেব প্রতিষ্ঠিত আছেন।
বাস্তবে পরমাত্মা স্বরূপ শিব শুধু দ্রষ্টা মাত্র আর শক্তি স্বরূপিনী তাঁর কন্যা অর্থাৎ মা নর্মদা এই জগৎ সংসারের পরিচালক।
মা নর্মদার অশেষ কৃপায় পরিক্রমাকালে পদে পদে আমার সঙ্গে মায়ের উপস্থিতি অনুভব করেছি। কৃপাময়ী মা তাঁর অনেক দিব্যলীলার সাক্ষী আমাকে করেছেন।
স্বয়ং মা নর্মদার কৃপাদৃষ্টি না থাকলে আমার পক্ষে এই পরিক্রমা সম্ভব হতো না।
নর্মদে হর্ 🙏🏻