29/04/2022
আমার দেখা সেলুলার জেল (৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৬)
আন্দামানে যেমন রয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য, তেমনই রয়েছে এক করুন ইতিহাস। সেই করুন ইতিহাস জানতে আজ আন্দামান ভ্রমণের প্রথম দিনই পোর্ট ব্লেয়ারের হোটেল থেকে গাড়ি করে চলে এলাম সেলুলার জেলে।
গাড়ি থেকে নেমে হলদে সবুজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের মূল ফটক দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম ঐতিহাসিক সেলুলার জেলে। এই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের ফার্স্ট ফ্লোরে থাকতেন জেলার ডেভিড বারি এবং নীচের ফ্লোরটিকে ব্যবহার করা হতো জেলের গোডাউন হিসেবে। জেলের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে আমাদের গাইড জানালো মোট সাতটি wings/বিল্ডিং নিয়ে এই সেলুলার জেলটি তৈরী হয়েছিল ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর সময় নিয়ে। যদিও বর্তমানে রয়েছে ৩ টি wings/বিল্ডিং। অপর ৪ টি wings/বিল্ডিং বিভিন্ন সময়ে ভূমিকম্প, জাপানিজরা আন্দামান অধিগ্রহণের সময় এই গুলোতে বাঙ্কার বানানো সহ নানাবিধ কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১৯৪২-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাপানিজরা এখানে অবস্থান করেছিল। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে আন্দামানে জনবসতি বাড়তে শুরু করলে ১৯৬৪ সালে আন্দামান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই ৪ টি বিল্ডিংয়ের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে তৈরী করে G. B. Pant হসপিটাল যা বর্তমানে আন্দামানের প্রধান হসপিটালে পরিনত হয়েছে। জেল ঘুরতে ঘুরতে গাইড জানালো বিনায়ক দামোদর সাভারকর, অবনী মুখার্জী, আব্দুল কাদের চৌধুরী, বঙ্কিম চক্রবর্তী সহ অসংখ্য বিপ্লবী যারা
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের এই জেলে এনে বন্দী করে রাখা হতো। সেই সময় মোট ৬৯৩ টি সেল নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই জেলটি। এত বেশি পরিমাণ সেলের সংখ্যা থেকেই জেলের নাম সেলুলার জেল। প্রত্যেক সেলে একজন করে বন্দী রাখা হতো, জেলের নির্মাণ এমন ভাবে করা হয়েছিল যে, কোন বন্দীই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারতো না। সেল গুলো দেখলাম অত্যন্ত সংকীর্ণ, কি করে যে এতো অল্প জায়গায় একজন বিপ্লবী থাকতেন ভেবেই পাচ্ছিলাম না!
সেল গুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলাম জেলের মাঝে অবস্থিত সেট্রাল টাওয়ারের দিকে, এই টাওয়ারই প্রত্যেক wings/বিল্ডিংয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, অথাৎ একটি wings থেকে অপর wings- এ যেতে হলে এই টাওয়ার হয়েই যেতে হবে। অসংখ্য সেল দেখতে দেখতে সিড়ি দিয়ে চলে এলাম জেলের সেকেন্ড ফ্লোরে। এই ফ্লোরের একটি সেলেই ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর, যার নামানুসারে সেলটির সাভারকর সেল নামকরণ করা হয়েছে। ১৯১১-১৯২১ সাল পর্যন্ত সাভারকর এই সেলুলার জেলে ছিলেন। সেকেন্ড ফ্লোর থেকে এবারে আমরা এসে পৌঁছলাম জেলের ছাদে। এই ছাদে উঠেই দেখলাম জেলের পেছন গড়ে ওঠা হসপিটাল টি। ছাদ থেকে নর্থ বে আইল্যান্ড এবং রস আইল্যান্ডেরও দেখা মেলে।
এরপর জেলের মাঝে লালচে টিন সেডের তৈরী একটি ঘরে এসে উপস্থিত হলাম। এই ঘরটিতে বিভিন্ন মডলের মাধ্যমে বিপ্লবীদের দ্বারা সেই সময় জেলে যেসব কাজ করানো হতো এবং বিপ্লবীদের কিভাবে অত্যাচার করা হতো সেইসব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মডেল গুলো দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম! কি অমানবিক অত্যাচার চলতো বিপ্লবীদের ওপর সেটার জীবন্ত রূপ নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে মডেলগুলো। এই প্রদর্শনী দেখে বেড়িয়ে আসতেই গ্রাউন্ড ফ্লোরে এক কোনায় ৪ টি সেল দেখিয়ে গাইড বললো এইগুলো হলো Condemned সেল। যাদের ফাঁসির আদেশ হতো, শেষের কয়েকদিন তাদের এনে এই ৪ টি সেলে রাখা হতো। সেইসময় তাদের ওপর কোনোরকম অত্যাচার হতো না বলেই জানালো আমাদের গাইড। জেলেই রয়েছে ফাঁসি ঘর। বর্তমানে কাঠের তৈরী, এটা নতুন করে ওই একই জায়গায় বানানো হয়েছে, ফাঁসির দড়িগুলোও নতুন লাগানো হয়েছে অর্থাৎ পরিবর্তিত। জেলের মধ্যেই রয়েছে সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী একটি শহীদ স্মারক। সারা দেশের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এটা তৈরী করা হয়েছে। জেলেই রয়েছে সন্ধ্যায় লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য সারি সারি চেয়ার। এরপর সন্ধ্যায় এই শো দেখতেই হবে ভেবে বেড়িয়ে এলাম জেল থেকে।
ঠিক সন্ধ্যা ৬ টায় আবার এসে হাজির হলাম ইতিহাসকে চাক্ষুষ করার জন্যে। সেলুলার জেলের বন্দীদের কাটানো ভয়াবহ কালো দিনের কাহিনী ওম পুরির কন্ঠস্বরে এবং বিভিন্ন লাইটিংয়ের দ্বারা একটি শোয়েব মাধ্যমে দেখলাম। সেই সময় বিভিন্ন সেল থেকে ভেসে আসা বিপ্লবীদের আর্তনাদ মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলছিল। কি কঠিন লড়াই করে তাঁরা সেলুলার জেলে দিনযাপন করতেন, কত শত প্রানের বিসর্জনে আমাদের এই স্বাধীনতা সেটা বইয়ের পাতায় পড়লেও একবার সামনে থেকে দেখে আসার অনুরোধ করছি।
ছবি :- নিজস্ব।