25/12/2023
চড়ুইভাতি-ভাল্কিমাচান-শীতকাল
ছোটবেলা গ্রামে দেখতাম শীতকাল এলেই গ্রামের বেশ কিছু লোকজন মিলে চড়ুইভাতি করত, আমাদের বাড়ি যৌথ ছিলো, আর গ্রামে পার্সোনাল জোন খুব এ কম তাই বেশ সানন্দেই পাড়ার অনেকেই জুড়ে যেতে পারতো চাইলেই, তখন ও পিকনিক এর এত চল ছিলনা। গ্রামের মানুষ রা নিজেরাই মোটামুটি সব আনাজ উৎপাদন করত নিজেদের জমিতে, বাইরে বড় গাড়ি করে রান্নার লোকজন নিয়ে গিয়ে পিকনিক এর প্রচলন খুব কম ছিলো আবার ছিলনা বললেও ভুল হবেনা। সবাই মিলে শীতের এক সকালে বেরিয়ে পড়তাম বাবা মা কাকা কাকি দাদা দিদিরা মিলে, চড়ুইভাতি হতো গ্রামের শেষের বড় মাঠে, নদীর ধারে। বা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর থেকে লাগানো গাছের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায়, চড়ুইভাতির দু চার দিন আগে থেকে শুরু হতো শুখানো কাঠ পাতা জোগাড় করা। পাড়ার প্রতিবেশীরা আজকাল কার মতো এত গণ্ডি রাখতনা, পাড়ার দাদারা মিলে জোগাড় করতো সব, অল্প কিছু করে টাকা দিয়ে পাড়ার দোকান থেকেই কেনা হতো চাল ডাল আর নিজেদের মাঠের সবজি , তা দিয়ে দিব্যি চলত। পাড়ার ডেকোরেটর থেকে ভাড়ানেওয়া হতো বড় ডেকচি কড়া খুনতি ।
তারপর চড়ুইভাতির দিন এলে সকাল সকাল দাতন মুখে দিয়ে, ছেলেরা ছুটত ডেকোরেটর্স এ জিনিসপত্র তুলতে, বাড়ির বউ মেয়েরা গোবর জলের ছড়া দিয়ে উঠোন নিকানো থেকে বাড়ির সব কাজ শেষ করত ঝপঝপ। তারপর সবাই চলতো চড়ুইভাতি এর উদ্দেশ্যে। আমাদের মতো বাচ্ছা দের ডেকোরেটর এর ভ্যান এ বসিয়ে দেওয়া হতো, আমরা কিনা দুধভাত ছিলাম তখন বড়দের কাছে, হাঁটতে পারবনা এত দূর, আমরা আর সব জিনিস পত্র বোঝায় ভ্যান চলতো এক অন্য রাস্তা ধরে (তখন বাবা মা রা কিন্তু ভয় পেতোনা পাড়ার কাকু দাদু বাকি দের, পাওয়ার কোন কারণ ছিলনা, কারন গ্রামের জীবন ছিলো সহজ সরল, গুড টাচ - ব্যাড টাচ এর মানসিকতা তখনও জন্ম নেইনি) । আর বাকিরা রাস্তা কম হবে তাই আলের পথের শর্টকাট নিয়ে পৌঁছাত গন্তব্যে।
তার পরেই শুরু মহাভোজের আয়োজন। মহিলারা হাসি ঠাট্টা এই মশগুল থাকলেও কুটনো কাটা আরও বাকি আয়োজন এ ছিল সিদ্ধ হস্তা, আর বাবা কাকু গোছের কেউ একজন রান্নার পুরো দায়ত্ব নিয়ে আগের থেকে বানিয়ে রাখা উনুনে আঁচ দিয়ে করা চাপাতো, আমরা গায়ে রোদ ধুলোবালি মেখে খেলতাম, ছোট গাছের ডাল ধরে ঝুলতাম, রান্না শেষ হলে নদীর জলে হাত পা ধোওয়ার নামে অর্ধেক স্নান করে ফেলতাম, কারণ ওই দিন কোনো বকাবকির বলাই নেই, তারপর শতরঞ্জী বিছিয়ে শাল পাতায় পরিবেশন করা হতো খাওয়ার, সেই পড়ন্ত বেলায় শাল পলাশ ইউক্যালিপটাস গাছের সরসর শব্দে আর পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদে পিঠ পেতে সেকালের চড়ুইভাতির রান্না খেয়ে মনে হত এই বুঝি স্বর্গ।
যত বড় হয়েছি, শহুরে ছোয়া লেগেছে এই স্বর্গ টা হারিয়ে গেছে, এখন সব প্রতি বছর এ ভালো মাপের পিকনিক স্পট ভাড়া নিয়ে, রান্নার ঠাকুর দিয়ে রান্না করিয়ে জমিয়ে খাওয়া হচ্ছে, ঘোড়া হচ্ছে, কিন্তু সব কিছুই কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। তার উপর উপছে পড়া ভিড় আর মাইকের আওয়াজ, দুমিনিট চোখ বুঝে একটু রোদের তাপ গায়ে মেখে সুন্দর টুকু অনুভব করবো , সেটা আর হয়ে ওঠেনা কোনমতে, তবে শীতে একদিন ঘুম থেকে উঠে এই সব মনে পড়ায় বেরোলাম একটা দিন কোলাহল থেকে কিছুক্ষন দূরে থাকবে বলে, গুগল ম্যাপে দেখে নিলাম রাস্তা , তারপর পাক্কা ১ ঘণ্টা বাইক রাইড তারপর পৌঁছালাম ভাল্কি মাচান, দেখার মতো তেমন কিছু নেই, কিন্তু অনুভব করতে পারলে আপনি রাজা। নিস্তব্ধ চারিদিক, সেই পুরনো শাল পিয়াল এর জঙ্গল, লাল মাটি, সেই পুরনো গ্রামের গন্ধ , এক দু পাল গরু নিয়ে কেউ চরাতে বেরিয়েছে, কেউ কেউ জঙ্গলে কাঠ পাতা কুড়িয়ে দ্রত চলছে বাড়ির রাস্তায় গিয়ে রান্না বসতে দেরি না হয় পাছে। এই যে গ্রামের জীবন, এই সহজ সরলতা , সাল পলাশ এর কাঁচা কাঠ পাতার গন্ধ, পাখি দের কলরব তুলে খাবার খুঁজে নেওয়া এই গুলো কি কিছু কম? দেখার বা অনুভব করার জন্য, না তাদের জন্য কখনোই নয় যাদের শিকড় গ্রামের মাটিতে ছড়িয়ে আছে।
#শীতযাপন