21/07/2025
শুশুনিয়া ... #পাহাড়ের কোলে ইতিহাসের হাতছানি
[28/02/2025][ # ভবঘুরে মন]
"এই বসন্তে অনেক জন্ম আগে
তোমায় প্রথম দেখেছিলাম আমি
হেঁটেছিলাম নিরুদ্দেশের পানে
সেই বসন্ত এখন ভীষণ দামি
আমার কাছে, তোমার কাছে, আমার কাছে
বসন্ত এসে গেছে"
প্রাতহিক জীবনের উঠাপড়াতে বসন্ত কে আর আলাদা করে অনুভব করতে পারি না আমরা।এর জন্য রূঢ় বাস্তবতা হয়তো কিছুটা দায়ী ,বা মধ্যবিত্তের কিছু না পারা,বা কিছু না হয়েওঠার তীব্র অবসাদও কিছুটা দায়ী।তবু মাঝে মাঝে অবসরে মনের জানালা খুলে শৈশব,আর কৈশরের স্মৃতি গুলো এখনো উঁকি মরে।এই বসন্তে তাই সবাই মিলে ঠিক করলাম একবার শৈশবে ফিরে যাবো।সবাই মিলে তাই স্থীর করা হলো সামনা সামনি বাঁকুড়ার শুশুনিয়া ও তার আনুষাঙ্গিক পাহাড় গুলো পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াবো।দর্শনীয় স্থান হবে শুসুনিয়া , ঝান্টিপাহাড়, গাঙ্গ দুয়া ড্যাম, জয়পুরের জঙ্গল,আর পলাশের জঙ্গল।28 /2/2025 ভোর 4 .00 তে দেওড়াতে সবাই মিলিত হলাম, যথারীতি দেওড়া বড়বাবার মন্দিরে পূজা দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম আমরা, এইবারের সফর সঙ্গী আমি অনুপম,আর আমাদের বন্ধু বিশ্বজিৎ আর পুষ্পেন্দু দা।এইবার গোপাল আর শুভঙ্কর এর কিছু সমস্যার জন্য ওরা যেতে পারল না।বসন্তের ভোর বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভূতি,মাঝে মাঝে হালকা কুয়াশা,সবাই ঠিক করলাম প্রথম খড়গপুর এ দাঁড়ানো হবে। খড়গপুর পর্যন্ত তেমন কুয়াশা পেলাম না,ওখানে চা,কেক দিয়ে টিফিন সেরে শালবনী, গোদাপিয়াশাল ,বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া,ছাতনা হয়ে শুশুনিয়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। খড়গপুর ছাড়ার কিছুটা পর শুরু হলো শালবনীর ঘন অরণ্য আর তেমন ঘন কুয়াশা।কোনো রকমে রাস্তার ধারের সাদা বর্ডার দেখে বাইক চালাতে হচ্ছে আমাদের।কুয়াশা তে জ্যাকেট আর প্যান্ট ভিজে চুপচুপে অবস্থা । বিষ্ণুপুরে পৌঁছে রাস্তার ধারে একটা দোকানে বসে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া টিফিন আর চা খেয়ে একটু ফ্রেশ হলাম।ছাতনা হয়ে শুশুনিয়া পৌঁছলাম সকাল ১১ টা নাগাদ।আমদের আগে থেকে কোনো হোটেল ঠিক করা ছিল না,তাই হোটেল খোঁজা শুরু হলো,তবে এবারে ঠাকুর সহায় হলেন।আমরা সুলভ মূল্যে মরুতবাহা রিসোর্টে একটা কটেজ পেয়ে গেলাম যা তিনজনের থাকার জন্য যথেষ্ট।বাইক গুলো পার্ক করে আমরা রুম এ ঢুকলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য,বাইক চালানোর ক্লান্তিও ছিল।ভাত খেয়ে ঘুরতে বেরোলাম রিসর্টের বাগানে, শুসুনিয়ার পাদদেশে বিশাল জায়গা নিয়ে এই রিসর্ট, আছে রংবেরঙের ফুলের গাছ।বাচ্চাদের বিভিন্ন আকটিভিটি,আর নিজেদের পলাশ বাগান। কিছুক্ষন আমরা ঐ পলাশ বাগানে সময় কাটালাম।গাছের নিচটা ভোরে আছে লাল পলাশে,মনে হবে যেন কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে।এত পলাশ আমরা আগে দেখিনি।হেঁটে যেতেও খারাপ লাগছে পাছে ফুলগুলি পায়ে মাড়িয়ে যায়।আমরা সবাই চুপ করে পলাশের ফুলের ওপর শুয়ে পড়লাম,গায়ে টুপটাপ করে খোসে পড়ছে রাঙ্গা পলাশ,এ যেন এক অনাবিল আনন্দ।। বিকেলে বাইক নিয়ে বেরোলাম ঝন্টি পাহাড় ঘুরে গাঙ দুয়া ড্যাম এর উদ্দেশ্য।শান্ত নিরিবিলি একটা লেক তার নিস্তরঙ্গ জলরাশি নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে আছে।সবাই লেকের পাড়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। হোটেলে ফিরলাম সন্ধ্যার সময়।রাত্রিতে খওয়া দাওয়া করে তাড়াতাড়ি বিছানা নিলাম ,কারণ ভোরে উঠে শুশুনিয়ার ট্রেকিং সারতে হবে।খুব ভোরে উঠে আমরা রেডি হলাম শুশুনিয়া ট্রেকিং করার জন্য।চারিদিকে ছেয়ে আছে ভোরের হালকা আঁধার,জলের বোতল ভোরে নিলাম পিঠের কিট ব্যাগে,ধীর পায়ে চড়াই ভাঙ্গতে লাগলাম আমরা।চারদিকে নানা অচেনা গাছ,আর পাহাড়ি জংলী ফুলের গন্ধে চারিদিক ভোরে আছে।কিছুটা উঠেই আমাদের হাঁফ ধরে যাচ্ছে,কারণ আমরা পাহাড়ে চড়াই অনভ্যস্ত তাও বেশ কষ্ট করে উঠতে লাগলাম।কিন্তু উপরে উঠে সমস্ত কষ্ট ওসুল হয়ে গেলো চারিদিকে অপূর্ব দৃশ্য দেখে।উপরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফেরার রাস্তা ধরলাম।নিচে নেমে দেখলাম আমাদের জলের বোতলে জল সব শেষ,কিন্তু তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে,জল কিনব কিনা ভাবছি এমন সময় এক আদিবাসী লোক বললো এখানকার পশ্রবনের জল খুব ভালো,এখানকার সবাই ওটাই খায়।আমরাও বোতলে ভর্তি করে খেলাম, অপুর্ব তার স্বাদ।এতই ভালো লাগলো যে বোতলে করে ভোরে নিলাম বাড়ির জন্য।নিচে অনেক ছোট ছোট দোকান ,সেখানে বিভিন্ন গিফট দেওয়ার জিনিষ বিক্রি হচ্ছে।আমরা সবাই বাড়ির জন্য কিছু কিছু জিনিষ কিনে রওনা দিলাম রিসর্টের উদ্দেশে।তাড়াতাড়ি বাইক রেডি করে আমরা চেক আউট করলাম।এখনো একটা জায়গা বাকি তাই সময় নষ্ট করা যাবে না,এবং সেটা আমাদের সবার প্রিয় জয়পুরের জঙ্গল।জয়পুরের জঙ্গলে পৌঁছলাম দুপুর ১২ টা নাগাদ। এর আগেও অনেক জঙ্গল দেখেছি।কিন্তু জয়পুরের সৌন্দর্য আমদের সবার মন কেড়ে নিলো।প্রচণ্ড নিবিড় আর সুউচ্চ শাল গাছের জঙ্গল।কিছুটা অফ রোড চালিয়ে পৌঁছে গেলাম ব্রিটিশ দের তৈরি এয়ারস্ট্রিপ এর ওপর।স্থানীয় মানুষ এটাকে চাতাল বলে।এই গভীর জঙ্গল কেটে কিভাবে যে বিমান ওঠা নামার রানওয়ে বানিয়ে ছিল , ভাবলে এখনো অবাক লাগে।ওখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দ্যেশে ।কিন্তু দুপুর হয়েছে, পেটে খিদের জ্বালা তাই ঠিক করলাম বিষ্ণুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ির পথ ধরা হবে।দুপুরে বিষ্ণুপুরের একটা ধাবাতে খাওয়া সেরে রওনা হলাম বাড়ির উদ্দ্যেশে , জঙ্গল ও পাহাড় কে কথা দেওয়া রইলো অন্য আর এক বসন্তে দেখা করার।।