16/03/2023
ভবঘুরে [১৬.০৩.২০২৩ ]
যেখানে সময় থেমে যায়, সেখানে জীবন স্তব্ধ হয়,সেই জীবন আমরা চাই না। সময় আর জীবনের থেমে থাকা আমাদের না -পসন্দ। জীবন আমাদের কাছে শাশ্বত ,বহমান, যেন স্রোতস্বিনী নদীর মতো। নদী যেমন তার প্রতি বাঁকে কত রহস্য লুকিয়ে রাখে,জীবন ও তেমন। নিশ্চল,আর নিস্তরঙ্গ জীবন এর স্বপ্ন কেই বা দেখতে চাই বলুন....
এখানে কবির একটা গান বার বার মনে পড়ে , ঠোঁটেও আসে"আমি চঞ্চল হে
আমি সুদূরেরও পিয়াসি,.....ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর,
তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি,
মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই
সে কথা যে যাই পাশরি,
আমি চঞ্চল হে
আমি সুদূরেরও পিয়াসি..."। তবে অসীম কে অনুভব করা এই সসীম, ক্ষুদ্র জীবের কম্মো নয়। তবে এইবার অসীম আর সুদূর কে অনুভব করার নেশায় সবাই আরো একবার বেরিয়ে পড়লাম। যাত্রাপথ খড়গপুর,ঘাটসিলা, টাটানগর,চান্ডিল,রাঁচি, হুড্রু,দশম ,হয়ে পাত্রাতু ভ্যালি। আর ফিরবো পুরুলিয়া ,বেলপাহারি হয়ে।এটা আমাদের এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে লম্বা জার্নি হবে...প্রায় ১০০০ কিমি।সময় মাত্র দু দিন।
২৪.০২.২০২৩. ভোর ২.৪৫ এ সবাই দেওড়া তে উপস্থিত হলাম...এইবারের সফর সঙ্গী চন্দন, বিশ্বজিৎ,গোপাল, শুভঙ্কর, পুস্পেন্দু দা,এবং আমি অনুপম... পাস্পেন্দু দা এই প্রথমবার আমাদের সফর সাথী হলো.একটা ভয় সবার মনেই ছিল "ভোর রাতে যদি কুয়াশা হয়, তা হলে মারাত্মক অসুবিধা হবে"পূর্ব আলোচনা অনুযায়ী আমাদের প্রথম স্টপ হবে খড়গপুর...কিন্তু পাঁশকুঁড়া ছাড়ার পর মনের ভয় টা বাস্তব এ রূপ নিলো,এত কুয়াশা যে বাইক এর স্পীড ৩০ কিমি/ ঘণ্টা তে নেমে এলো, আর বাইক এবং আরহী রীতিমত কুয়াশা স্নান করতে থাকলো,জ্যাকেট পত্র ভিজে চুপ চুপে হয়ে গেলো,তার উপর দোসর হলো ভোরের ঠান্ডা হাওয়া,কোনো রকমে খড়গপুর পৌঁছে একটা চা দোকানে দাঁড়ানো হলো,চা দোকানের আঁচে শুকিয়ে নেওয়া হলো জ্যাকেট।এরপর লোধাসুলি জঙ্গল অতিক্রম করে ঘাটসীলা ছাড়িয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় ধাবা দেখে দাঁড়ানো হলো ব্রেকফাস্ট এর জন্য। খাবার বলতে । লিট্টি আলুচোখা আর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া ডিম সেদ্ধ, আর চা।যা হোক করে উদর পূর্তি করে আবার যাত্রা শুরু,গন্তব্য সুবৃহৎ চন্ডিল ড্যাম,প্রায় সকাল ৯:৩০ নাগাদ পৌঁছে গেলাম চান্ডিল ড্যাম এ। কোনো পর্যটক এর ভিড় নেই,প্রকৃতি কে একেবারে আপন করে পেলাম । আনন্দে পথের ক্লান্তি মুছে গেলো, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা বিশাল ড্যাম,কিছু হাঁস আর পরিযায়ী পাখি খেলে বেড়াচ্ছে আপন খেয়ালে,কানে ভেসে আসছে পাখির কলতান,হাওয়া আর পাতার শব্দ, কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম,কিছু সেল্ফি তুলে আবার যাত্রা শুরু... জামশেদপুর, টাটা নগর,ডিমনা ছাড়িয়ে পৌঁছাতে হবে হুড্রু জলপ্রপাতে।
হুড্রু জলপ্রাত এ পৌঁছালাম সকাল ১১:৩০ নাগাদ,জল খুব একটা বেশি নেই, তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না । কিছু স্থানীয় আদিবাসী মহিলারা পেয়ারা ,কুল,চানা ইত্যাদি বিক্রি করছে জলপ্রাত এর সামনে,আমরা কিছু পেয়ারা কিনলাম,তাই দিয়েই ক্ষুদা নিবৃত্ত করলাম সবাই,, খুব ঠান্ডা আর তাজা,সবাই পেট ভোরে খেলাম।বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তীব্রতাও বাড়তে লাগলো,তাই সবাই মিলে ঠিক করা হলো রাঁচি শহরে না ঢুকে বাইপাস হয়ে চলে যাবো পাত্রাতু ভ্যালি । পাত্রাতু ভ্যালি পৌঁছালাম দুপুর ১:৩০ নাগাদ। হেয়ারপিন বাঁকে বাইক চালানোর অ্যাডভেঞ্চার সবাই খুব উপভোগ করলাম,কিন্তু সূর্য তখন মাথার ওপর,,তাই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হওয়ার জন্য হোটেল এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম সবাই ,হোটেল শিবম প্যালেস এ পৌঁছলাম দুপুর ২:৩০ নাগাদ।
হোটেলে পৌঁছে, বাইক গুলো পার্ক করে,কোনরকমে হোটেলের বিছানা নিলাম,সবাই একে একে স্নান সম্পন্ন করলাম,বেশ ঠান্ডা জল,ফ্রেশ হবার পর সবাই দুপুরের খাবার খেতে বাইরে বেরোলাম। খাবার বলতে ভাত ,চিকেন। রান্না মোটামুটি ,তবে খিদে পেটে সবই অমৃত লাগলো।সবাই আলোচনা করে ঠিক করা হলো বিকেলে ঘুম থেকে উঠে পাত্রাতু লেকে বেড়াতে যাওয়া হবে, কিন্তু এত লং ড্রাইভ এর ক্লান্তি কাউকেই উঠতে দিল না।বিকেলে একটু বাজারে ঘুরাঘুরি করে , সন্ধ্যায় মাংস রুটি খেয়ে তাড়াতাড়ি বিছানা নিলাম...বেশ ঠান্ডা ওখানে,কম্বল মুড়ি দিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম...কারণ ভোরে উঠে আবার যাত্রা শুরু করতে হবে। ভোরে উঠে সবাই স্থির করলো, আগের দিন দুপুরে যেহেতু পাত্রাতু ভ্যালি ভাল করে ঘোরা হয় নি , তাই আজ খুব সকালে পাত্রাতু ভ্যালি দিয়ে যাত্রা শুরু হবে। যেমন কথা তেমন কাজ,সবাই বেরিয়ে পড়লাম প্রথম ভোরের মিষ্টি আলোয় সিক্ত পাত্রাতু ভ্যালিকে দেখবো বলে। কিন্তু একটা ঘটনা ঘটলো,, আমাদের বন্ধু চন্দন এর হেলমেট টা খুঁজে পাওয়া গেলো না...আমরা সবাই নিরুপায় হয়ে ভাবতে লাগলাম কিভাবে হেলমেট এর ব্যাবস্থা করা যায়। কারণ বাজার খুলতে তখনও ৩ ঘণ্টা বাকি,অবশেষে এক পেট্রোল পাম্পের সহৃদয় কর্মচারী তার নতুন হেলমেট টি আমাদের কে কিছু পয়সার বিনিময়ে দিলেন,,, আর সেই ফাঁকে পরিচয় হয়ে গেলো এক মিসুকে বাঙালি কাকুর সাথে,,,ওখানে চা বিস্কুট খেয়ে সবাই খুব খুশি হয়ে এগিয়ে চললাম পাত্রাতু ভ্যালির দিকে,,,সকালে সে এক অন্য রূপ ,,, ঠান্ডায় হাত কনকন করছে...আর তারই মধ্যে হাজির হয়েছে সমস্ত সুপার বাইকারের দল রাইড করার জন্য। আমরা খুব উপভোগ করলাম ,,,কিছু ছবিও তুললাম,,,কিন্তু দেরি করা যাবে না,,,কারণ এর পরের গন্তব্য লাল পলাশের দেশ পুরুলিয়া । রাস্তা অনেক ,অগত্যা বেরিয়ে পড়লাম পাত্রাতু ভ্যালি থেকে পুরুলিয়ার উদ্দশে,,,মনে মনে খুব উত্তজনা "পলাশের জঙ্গল তো সিনেমা,টিভি তে অনেক দেখেছি,কিন্তু এইবার সচক্ষে দেখবো",,,রাঁচি থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার রাস্তার বর্ণনা কি এর করবো,,,সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য ,,,কোথাও দেখি রাস্তার দুই ধারে সমস্ত জঙ্গল এর নাম না জানা গাছ,,,কিন্তু তার পাতা সবুজ এর বদলে টকটকে লাল,,এই প্রথম বার সেই দৃশ্য দেখে চোখ ধাঁদিয়া যাওয়ার উপক্রম ,..আবার কখনো দেখি রাস্তার দুই ধারের পাহাড় জঙ্গল ভরে আছে আগুন রাঙা পলাশ এ..আর ভাবি সিনেমা টিভি চেয়ে এ ঢের ঢের বেশী সুন্দর,,,এই সৌন্দর্য কে লেন্স বন্দী করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়,,,সবাই শুধু অভিভূত ,আর অবাক হয়ে হ্যাঁ.... করে তাকিয়ে থাকি,, আর কিছু ছবিই তুলি।।।পুরুলিয়া পৌঁছে প্রথম বাইক দাঁড় করানো হয় চরীদা গ্রামে।এর আগেও আমি পুরুলিয়া এসেছি দুই বার কিন্তু এই প্রথম বার চরিদা তে এলাম,,প্রথম বার দেখলাম স্থানীয় অধিবাসী দের মুখোশ তৈরির কৌশল।কিছু কেনাকাটা করে পৌঁছে গেলাম বাঘমুন্ডি।ওখান থেকে অযোধ্যা পাহাড়। লোয়ার ড্যাম , আপার ড্যাম,মার্বেল লেক ঘুরে ,খয়রা বেড়া ড্যাম এ সবাই উপস্থিত হলাম স্নান করার জন্য। দুপুরের তীব্র দাবদাহ,,,তার মধ্যেই ঠান্ডা ,শীতল,স্বচ্ছ,লকের জলে স্নান করার যে কি অনুভূতি তা বোঝাতে পারবো না।সবাই স্নান সেরে সতেজ হয়ে স্থানীয় হোটেলে ভাত আর মাংস খেয়ে ,বেরিয়ে পড়লাম বেলপাহাড়ির উদ্দেশ্যে,,যখন বেলপাহাড়ি পৌঁছালাম সন্ধ্যা হব হব করছে,,,কিন্তু রাস্তার অ্যাডভেঞ্চার ,আর সৌন্দর্য আমাদের কে অভিভূত করলো, বেলপাহাড়িতে একটু রেস্ট নিয়ে চা আর বিস্কুট টিফিন করে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। তবে পথে কিছু দুঃখের ঘটনাও ঘটলো,পুষ্পেন্দু দার মোবাইল হোল্ডার থেকে পড়ে স্ক্রীনটা ভেঙে গেলো,চন্দন এর বাইক অভার হিট হয়ে বন্ধ হলো কিছু ক্ষণ এর জন্য,,অবশ্য ৫ মিনিটের মধ্যে স্টার্ট নিয়ে স্ববিভিক হলো,শুভঙ্কর এর বাইকের হেড লাইট কেটে গেল। খড়গপুর বাইপাশে সবাই পৌঁছালাম রাত ৯.৩০ তে।এবার সোজা বাড়ির পথে রওয়ানা,,
মনরে মাঝে দুঃখ সুখের স্মৃতি মিশে একাকার,,,তাও যেনো সুখের স্মৃতি বহুগুণে ছাপিয়ে গেছে দুঃখ কে,,,মনের মাঝে আগুন রাঙা পলাশ,শিমুল,,,কানে ভাসছে পাহাড়ি ঝর্ণা আর পাখির কলতান,, আর বন্ধুদের খুনসুটি,,,,বারবার মনে হচ্ছে সেই গানটা
" বন্ধু চল.. রোদ্দুরে..
মন কেমন.. মাঠজুড়ে..
খেলবো আজ ওই ঘাসে
তোর টিমে তোর পাশে
ফুটকড়াই, অ্যান্টেনা, হাফ চিঠি, হাফ প্যাডেল
আয়না আর জলপরীর গল্প বল
বন্ধু চল..
সাপ লুডো, চিত্রহার, লোডশেডিং, শুকতারা
পাঁচসিকের দুঃখদের গল্প বল
বন্ধু চল..
বন্ধু চল... বলটা লে.
রাখবো হাত তোর কাঁধে
গল্পেরা অই ঘাসে
তোর টিমে তোর পাশে" ।।
( সমাপ্ত )