05/02/2026
'কাছে দূরে'- র চুপির চর ভ্রমণের সঙ্গে বাড়তি পাওনা ছিলো ফেরার পথে কালনা ভ্রমণ। যদিও কালনার ঐতিহ্যের সবটুকুর স্বাদ নেওয়া সম্ভব হয়নি, তবু যা দেখা হলো তাই বা কম কি! রইলো তারই এক ঝলক।
১) শহর কালনার অম্বিকা শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী কালীর কাহিনী
🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌼🌺👣🌺
বর্ধমানের রাজারা ছিলেন শৈব্য অর্থাৎ শিবের উপাসক। তাই কালনা জুড়ে বহু শিবমন্দিরের অস্তিত্ব দেখা যায়। এছাড়া ও রাজপরিবারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বহু মন্দির, কালনাকে করে তুলেছে মন্দির শহর। পাশাপাশি এই শহর এক সময়ে তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান ছিল, তারও বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। সারা কালনা শহর জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন কালী-মন্দির। সিদ্ধেশ্বরী কালী, সাধনকালীর সাধন কুঞ্জ, সিদ্ধান্ত কালী, আনন্দময়ী কালী, সত্যনাথের কালী, কমলাকান্তের কালী, ভবা পাগলার কালী -- তালিকা সুদীর্ঘ। কালনা শহরকে তাই কালী-ময় কালনা বা কালী-ক্ষেত্র কালনা বললে ও অত্যুক্তি হয়না। কালী থেকেই এই শহরের নামকরণ কালনা কিনা তা নিয়ে আজও চর্চা চলে। এই শহরের আরাধ্যা দেবী মা সিদ্ধেশ্বরী।
যাঁর পূর্ব নাম অম্বিকা, তাঁরই নাম অনুসারে এই শহরের নাম অম্বিকা। হাজার বছরের পুরাতন এই দেবীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু জনশ্রুতি। রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্যে দেবী অম্বুয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, "তোমার মহিমা মা তা কি বলিতে পারি, অম্বুয়ার ঘাটে বন্দে কালিকা ঈশ্বরী"। এই অম্বুয়ার ঘাট হলো সিদ্ধেশ্বরী বাড়ির নিকটস্থ গঙ্গার ঘাট, যা অম্বুয়ার ঘাট বা সিদ্ধেশ্বরী ঘাট নামে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের ফলকে যা উল্লেখ আছে সেই অনুযায়ী ১৭৪১ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজা চিত্রসেন, অম্বুরীশ ঋষির উপাস্য দেবী মাতা অম্বিকা বা সিদ্ধেশ্বরীর মন্দির পুননির্মাণ তথা সংস্কার করান। কিন্তু জনশ্রুতি অনুসারে এর হাজার বছর পূর্বে আনুমানিক ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে দেবী অম্বু বা অম্বুয়া তন্ত্রসাধক অম্বরীশের আরাধ্যা দেবী ছিলেন।
মন্দিরের নিকটেই অম্বিকা পুকুর থেকে নিমগাছ কেটে দেবীর মূর্তি তৈরি হয়েছিল। অম্বরীশ মুনির নামানুসারে দেবীর নাম হয় অম্বু বা অম্বুয়া, পরে তা হয় অম্বিকা। দেবী এখানে বামা কালী, দেবীর উচ্চতা পাঁচ ফুট, দেবী দন্ডায়মানা ভয়ঙ্করী রূপে।দেবীর এই রূপকে অনেকেই মনে করেন জ্ঞান মার্গ ও ভক্তি মার্গে র মিলিত রূপ, আবার কেউ কেউ বলেন, তৎকালীন আর্থ সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে দেবীর জেহাদ।
জনশ্রুতি অনুসারে, বহু কাল আগে মন্দির-সংলগ্ন অঞ্চলে একটি জলাশয়ের পাড়ে এক বটগাছতলায় কুলার উপরে জমাটবদ্ধ অবস্থায় একটি ঘট খুঁজে পান কালীপদ অভিলাষী ঋষি অম্বরীশ বা অম্বু ঋষি। সে সময় ওই অঞ্চল ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, কিছুদূরেই শ্মশান। অনেকে মনে করেন, জনমানবহীন এই জঙ্গলে পূজিতা মাতৃকা-ঘট হয়তবা ডাকাতদের দ্বারাই পূজা পেতেন। পুকুরের পাড়ে খুঁজে পাওয়া এই ঘট প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে শুরু করেন অম্বু ঋষি। তাঁর নামানুসারেই এই দেবী অম্বিকা এবং ওই জলাশয়টি ক্রমে অম্বিকাপুকুর নামে লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তিনি সেই সময়ে বর্তমান মন্দিরের স্থানে অবস্থিত বটগাছের তলায় ওই ঘট প্রতিষ্ঠা করে সাধনা করতেন ও পরে সিদ্ধিলাভ করেন। তখন কোনও দেবীমূর্তি ছিল না।
পাঁচ পুরুষ গুরু-শিষ্য পরম্পরায় ওই ভাবেই সেবাকার্য চলে। স্থানীয় ভক্তদের বক্তব্য অনুসারে বলা হয়, শেষ সাধক ঈশ্বরীশ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মূর্তি তৈরি করান। নিমগাছের একটি কাষ্ঠখণ্ডেই তৈরি করানো হয় মূর্তি। ছোট বহরকুলির গাঙ্গুলীদের পুকুড়পাড়ে যে তিনটি নিমগাছ ছিল, তার মাঝেরটি নিয়ে এসে কলকাতার নিমতলার এক দারুশিল্পীর দ্বারা মূর্তি নির্মাণ করানো হয় এবং পঞ্চমুন্ডির আসনের উপর প্রতিষ্ঠা করে পূজারম্ভ হয়। সে সময় ওই মূর্তির ঠিক পিছনেই ছিল গঙ্গা ও মহাশ্মশান। মন্দির প্রতিষ্ঠা হয় তারও অনেক পরে। মন্দিরগাত্রে খোদিত ফলকটিতে মা অম্বিকাকে সিদ্ধেশ্বরী কালিকা বলে উল্লেখ করা আছে। মন্দির-গাত্রে খদিত টেরাকোটার একটি ফলকে লেখা আছে –
“শুভামস্তু শকাব্দ : ১৬৬৩/২/২৬/৬
শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী দেবী
শ্রীযুক্ত মহারাজা চিত্রসেন রায়স্য।
মিস্ত্রি শ্রী রামচন্দ্র।”
এই ফলক অনুযায়ী সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দিরটি আনুমানিক ১৭৪০ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের রাজা চিত্রসেনের আমলে তৈরি হয়। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরটি বাংলার নিজস্ব দেউলরীতিতে নির্মিত হয়েছে। থাম বা খিলানের উপর দুটি, পাশাপাশি চাল সহযোগে জোড়বাংলা শৈলীতে নির্মিত। মন্দিরের ভিতরের অংশটি গর্ভগৃহ এবং সম্মুখ ভাগ অর্ধমন্ডপরূপে ব্যবহৃত হয়। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে গর্ভগৃহে পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রথমে পাঁচটি সিঁড়ি আছে। তারপর রয়েছে চারণ বা চাতাল এবং এর পর আরও ন’টি সিঁড়ি সরাসরি মূল মন্দিরে মিলিত হয়েছে।
প্রাচীন তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হিসাবে অম্বিকা বা অম্বুয়া অঞ্চলের উল্লেখ আছে চৈতন্য-জীবনী গ্রন্থগুলিতেও। বাংলার মন্দির-নির্মাণ শিল্পের অন্যতম নিদর্শন এই মন্দির। এক ঝলকে মন্দির দেখলে মনে হবে দু’টি খড়ের চালা একসঙ্গে জোড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহটি সমতলের থেকে কিছুটা উঁচুতেই অবস্থিত। কাছাকাছি বয়ে যাওয়া ভাগীরথীর বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতেই এমনটা করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে মন্দিরে পূজিতা নিমকাঠ বা দারুব্রহ্ম নির্মিত দণ্ডায়মানা বামাকালী মূর্তিটিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এতে নেই কোনও সূক্ষ্ম কাজের ছোঁয়া। দারু-নির্মিত দেবী মূর্তির পদতলে আড়াআড়ি ভাবে শায়িত শবরূপী শিব, অর্থাৎ মাতৃকা মূর্তিটি বাম দিকে শিবের মাথা এবং ডান দিকে রয়েছে মহাদেবের পা। কিন্তু, দেবীমূর্তির সঙ্গে শিবমূর্তির কোন সামঞ্জস্য নেই। কারণ দেবী মূর্তিটি দারুনির্মিত হলেও শিবের মূর্তি দারু-নির্মিত নয়। যা থেকে অনুমান করা যায় শিবের মূর্তিটি পরে স্থাপন করা হয়েছে। কালক্রমে অম্বরীশের দ্বারা পূজিত সেই ঘট হয়ে গেছে গৌণ, তার স্থান হয়েছে দেবীমূর্তির ডান পাশের একটি কোণে। সারা বছর দেবীকে দর্শন করা গেলেও শুধুমাত্র কোজাগরী পূর্ণিমার পরের কৃষ্ণা পঞ্চমী থেকে কৃষ্ণা ত্রয়োদশী পর্যন্ত হয় দেবীর অঙ্গরাগ। এই সময়ে মা সিদ্ধেশ্বরী দিগম্বরী থাকেন বলে মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। বছরের ওই নির্দিষ্ট সময় পুজো, ভোগ— সব কিছুই হয় মন্দিরের বাইরে। অঙ্গরাগের শেষ দিন, অর্থাৎ ভূত-চতুর্দশীর দিনে দেবীর দিগম্বরী বেশ জনসমক্ষে দেখানো হয় সন্ধ্যে সাতটা থেকে রাত বারোটা অবধি। এরপর বস্ত্র পরিয়ে শুরু হয় পূজার প্রস্তুতি। বছরভর দেবীর পুজো হলেও কার্তিক অমাবস্যায় সিদ্ধেশ্বরীর পুজো ঘিরে মেতে ওঠেন পুরবাসীবৃন্দ। কালী পুজোর দিন দু’টি কালো ছাগ, দু’টি মেষ শাবক, চালকুমড়ো বা বলি কুমড়ো, আখ ও ডাব বলি দেয়ার রীতি এখানে বহুকাল থেকে প্রচলিত। এই বামাকালীর পূজা হয় তন্ত্রমতে।
কথিত আছে, শ্মশানের পাশে পঞ্চমকারে পূজিতা এই বামা কালীর কাছে আগে নাকি নরবলিও হত। ডাকাতেরা কাটা মাথা ঝুলিয়ে দিয়ে যেত মন্দিরের সামনের খুঁটিতে। আর এই নরবলির প্রতীক স্বরূপ পরবর্তীকালে শুরু হয় ডাব বলি। মন্দির সম্মন্ধে এই ধরণের আরও অনেক প্রচলিত কথা ও কাহিনি শোনা যায় স্থানীয় প্রবীন অধিবাসীবৃন্দের মুখে। আগে মন্দির-সংলগ্ন অম্বিকাপুকুরের জলেই হতো নিত্যপূজার নানা কাজ।
এক সময়ে নাকি এই পুকুরের জলের মধ্যেই রাখা থাকত বিভিন্ন পূজা-পার্বণে ব্যবহৃত প্রচুর বাসনপত্র। গরিব মানুষরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেইসব বাসনপত্র বিয়ে বা অন্য কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে, আবার সেগুলি জলের মধ্যে যথাস্থানে রেখে যেতেন। ঋষি অম্বরিশের সিদ্ধপীঠের অধিশ্বরী এই সিদ্ধেশ্বরী কালী এভাবেই সুখে-দুখে কালনাবাসীর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন বলে অঞ্চলবাসীরা মনে করেন।
২) পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনায় অবস্থিত নবকৈলাস মন্দির বা ১০৮ শিব মন্দির ১৮০৯ সালে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র বাহাদুর নির্মাণ করেন । এটি দু'টি সমকেন্দ্রিক বৃত্তে সাজানো ১০৮টি আট-চালা শিব মন্দির নিয়ে গঠিত, যা এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। এর বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভেতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির রয়েছে, যাতে যথাক্রমে সাদা ও কালো শিবলিঙ্গ বিরাজমান ।
৩) কালনার রাজবাড়ি কমপ্লেক্সে অবস্থিত লালজী মন্দির বর্ধমানের রাজা কীর্তিচাঁদ রায় তাঁর মাতা মহারানী ব্রজকিশোরী দেবীর জন্য ১৭৩৯ খ্রীস্টাব্দে নির্মাণ করান। অন্যতম প্রাচীন টেরাকোটা মন্দির এটি। বিরল ২৫টি চূড়া বিশিষ্ট পঞ্চবিংশতি-রত্ন শৈলী-এর স্থাপত্য এবং এখানে রাধা-কৃষ্ণের পূজা হয় । কথিত আছে এখানে যে কৃষ্ণ মূর্তিটি আছে তা ব্রজুকিশোরী দেবি পেয়েছিলেন লালজী বলে এক ভিক্ষু/সাধুর কাছ থেকে। লালজী মূর্তিটি দিতে অরাজী হলে রানীমা ব্রজকিশোরী তাঁর রাধারানীর সঙ্গে কৃষ্ণের বিবাহ দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর লালজী এই মন্দিরেই থেকে যান পূজারী হিসাবে এবং এখানেই মারা যান। তাঁর নামেই এই মন্দিরের নাম। মন্দিরের গায়ে চমৎকার টেরাকোটার কাজ এবং সামনে গিরিগোবর্ধন মন্দির ও ১২ টি থামসহ নির্মিত সুদৃশ্য নাটমণ্ডপ রয়েছে ।
৪) অম্বিকা কালনার রাজবাড়ি চত্বরে অবস্থিত কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির (বা কৃষ্ণচন্দ্র জীউ মন্দির) বাংলার মন্দির স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন, যা ১৭১৭ শকাব্দে (১৭৫১-১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ) বর্ধমানরাজ ত্রিলোকচন্দ্রের মাতা লক্ষ্মীকুমারী দেবী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এটি একটি ২৫ চূড়া (১২+৮+৪+১) বিশিষ্ট (পঁচিশরত্ন) তিনতলা দক্ষিণমুখী মন্দির, যা পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত ।
কালনার কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
স্থাপত্য শৈলী: এটি একটি ২৫টি চূড়া বা রত্ন বিশিষ্ট মন্দির, যা ১২+৮+৪+১ বিন্যাসে সাজানো।
অবস্থান: কালনা শহরের রাজবাড়ি চত্বরের পূর্ব দিকে, লালজী মন্দিরের কাছে এটি অবস্থিত ।
পোড়ামাটির কাজ: মন্দিরের দেওয়ালে এবং সামনে তিন খিলানযুক্ত অলিন্দে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কাজ রয়েছে। এখানকার পোড়ামাটির প্যানেলে কৃষ্ণ ও বলরামের দ্বারকা যাত্রা, বিদেশী জলদস্যু জাহাজ, সামাজিক দৃশ্য, হাতির পিঠে জমিদার, পালকিতে রানী এবং বৈষ্ণবদের নৃত্য দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র এবং রাধারানীর মূর্তি পূজিত হয়।
৫) প্রতাপেশ্বর মন্দির কালনার রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের শেষ নির্মিত মন্দির। রাজা প্রতাপচাঁদের মহিষী প্যারীকুমারী দেবী ১৮৪৯ সালে নির্মাণ করান; এটি বাঁকুড়ার রামহরি মিস্ত্রির হাতে তৈরি। পোড়ামাটির (টেরাকোটা) অলঙ্করণের জন্য বিখ্যাত, যেখানে রামায়ণ ও কৃষ্ণলীলার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং এটি পশ্চিমবঙ্গের রেখ দেউল স্থাপত্যশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মন্দিরটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত।