14/04/2020
আমার লাদাখ ভ্রমন
প্যাং গং হ্রদ
প্যাং গং নামটার মধ্যেই কেমন একটা আকর্ষণ আছে। কেমন একটা চিন চিন গন্ধ। হবে নাই বা কেনো। 134 কিলোমিটার লম্বা লবণাক্ত জলের এই হ্রদের তিন ভাগের একভাগ মাত্র রয়েছে ভারতবর্ষে, অর্থাৎ কিনা লাদাখে। বাকি সম্পূর্ণ অংশ রয়েছে চিনে। বিভিন্ন ভ্রমণ পত্রিকায় যখন প্যাং গং এর ছবি দেখেছি, তখন অপলক চোখে চেয়ে থেকেছি তার মায়াবী নীল জলের দিকে। মনে মনে ভেবেছি, পারব কি কখনো এই মায়াবী নীলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে?
অবশেষে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার সামনে।
লাদাখ ভ্রমণের পঞ্চমদিন প্যাং গং যাওয়ার জন্য রওনা হলাম হুন্ডার থেকে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায় ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে পৌঁছেছিলাম তার কাছে। যেহেতু প্যাং গং থাকার কোনো পরিকল্পনা আমাদের ছিলনা, তাই বেশ সকাল সকাল রওনা হলাম। ফেরার সময় সেই পাঁচ বা ছয় ঘন্টা হাতে রাখতে হবে সেই কথা মাথায় রেখে।
প্রথমদিকে হুন্ডার থেকে খালসের পর্যন্ত রাস্তা খুবই ভালো । দুধারে রুক্ষ পাহাড়ের সারি, মাঝখান দিয়ে পিচ ঢালা মসৃণ রাস্তা। মাঝে কিছু অঞ্চল দেখতে পেলাম যেখানে মনে হলো রাস্তার পাশের নিচু জমিগুলো ভিজে, স্যাঁতসেঁতে। ভালো করে দেখার পর বুঝলাম নদীর জল নানাভাবে বিভক্ত হয়ে নিচু জমিগুলো ভিজিয়ে দিয়েছে, আর ওই জায়গায় তৈরি হয়েছে সবুজ তৃণভূমি। সেই সবুজের মধ্যে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছে লাল, সাদা বা কালো রঙের ঘোড়া। সঙ্গে আছে ভেড়ার পাল। চারদিকের রুক্ষ দৃশ্যপটের মধ্যে প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর সবুজের ছোঁয়া চোখকে যেন অন্যরকম এক আনন্দ দিল। প্রায় তিন সাড়ে তিন ঘণ্টা জনমানবহীন পাহাড়ি পথে শায়ক নদীকে পাশে রেখে চলার পর হঠাৎই রাস্তা গেল হারিয়ে। দেখলাম ছোট বড় অসংখ্য নুড়ি ভর্তি একটা জায়গা দিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। কোনো দিক নির্দেশও নেই। আমার ধারণা এই নুড়িভরা অঞ্চলটা একটি নদিখাত। মনে মনে একটু ভয় পেয়ে গেলাম। ,"কোথায় চলেছি আমরা"? তবে ভরসা ছিল আমাদের সারথির উপর। অত্যন্ত পাকা ড্রাইভার। সব থেকে বড় কথা বহুদিন ধরে এই পেশায় থাকার কারণে এই সমস্ত অঞ্চল তার হাতের তালুর মত চেনা। বেশ কিছুক্ষন ওই নুড়ির ওপর দিয়ে চলার পর আবার রাস্তার দেখা পেলাম। এবার নরম মাটির রাস্তা। হঠাৎই দেখা পেলাম তার। যার জন্য এত দীর্ঘ পথ পেরোনো। এসে পৌঁছলাম স্পাংমিক গ্রাম। যে গ্রামের শুরু থেকেই নজরে পড়ে প্যাং গং হ্রদের সুনীল জলরাশি।
গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম তার কাছে। সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে গেলো শিহরণ। নীল রঙের যে কত শেড হতে পারে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। কিছুক্ষণের জন্য যেন নিজের মধ্যেই হারিয়ে গেলাম। মনে হলো দেবদেবীদের বাসস্থানে এসে পড়েছি। বহু মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও মনে হলো প্রত্যেকেই নিজের মধ্যেই নিমগ্ন।
কিছুক্ষন বাদে আত্স্থ হয়ে ক্রমশঃ নিচে নেমে পৌঁছে গেলাম তার একেবারে কাছে। তাকে স্পর্শ করার উদ্দেশ্যে। কী ভীষণ ঠান্ডা জল! জল তো নয়, যেন অতীব স্বচ্ছ কাঁচ! নানা আকারের, নানা রঙের নুড়ি স্পষ্ট দৃশ্যমান সেই জলের নিচে। অকল্পনীয় সে দৃশ্য। দিশাহারা আমার মেয়ে, কি যে করবে ভেবে পাচ্ছে না। বাবা, মা, মানি কাউকে বাদ দিছে না বিভিন্ন পোজে ছবি তুলে দেবার জন্য।তবে পাগল যে শুধু আমার মেয়েই হয়েছে তা নয়। ওখানে উপস্থিত বাচ্চা, বুড়ো প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে পাগলামো করছে। এক হবু দম্পতি তাদের প্রি ওয়েডিং শ্যুট
করছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়( প্রায় সিনেমার শ্যুটিং এর মত আরকি)! কম বয়েসি ছেলেমেয়েরা তো উত্তেজনায় কি করবে ভেবেই পাচ্ছে না। সব থেকে উপভোগ করলাম একটি দৃশ্য দেখে যেখানে বাড়ির কর্তা ইউ টিউবে ব্লগ তৈরি করার জন্য ধারাভাষ্য দিতে ব্যস্ত প্যাং গং এর তীরে বসে, আর ওনার কন্যা ও সহধর্মিণী হ্রদের তীরে, প্রায় জল ছুঁয়ে, চোখ বুজে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে আছেন, নাকি শবাসন করছেন বোঝা গেলো না। এক যুবক তো উত্তেজনায় পাগল হয়ে হ্রদে নেমে ওই ঠান্ডা জলেই সাঁতার কাটতে লাগলেন।
কখন যে প্রায় দুঘন্টা সময় পার হয়ে গেলো টের পেলাম না। সম্বিত ফিরল পেটে ছুঁচোর ডন বৈঠক দেওয়াতে। বেলা তিনটা বাজে।ফেরার কথা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো।আরো কিছুক্ষন থাকতে পারলে মনটা ভালো লাগতো। কিন্তু বোনের শরীরটা হঠাৎই খারাপ করতে লাগলো। ফলে অনিচ্ছা স্বত্বেও ফেরার পথ ধরলাম। আসলে আমাদের প্ল্যানিংএ একটু ভুল হয়েছিল। হুন্ডার থেকে আসার সময় একটু ভারী খাবার সঙ্গে করে আনা দরকার ছিল। তা হলে আরও কিছুক্ষণ বসতে পারতাম প্যাংগং এর তীরে। অগত্যা কিছুটা এগিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করে ফিরে চললাম লেহ। এবার অন্য পথে, চাঙলা পাস হয়ে। উপভোগ করলাম চাংলার অপরূপ সৌন্দর্য। প্রায় ঘন্টা পাঁচেক পর রাত আটটা নাগাদ পৌঁছলাম লেহ।
at Home Stay safe