14/10/2026
সেই ছেলেবেলা থেকেই গোয়েন্দার মতো আমি শরৎকালকে অনুসরণ করে আসছি। এই ম্যাজিকওয়ালার রহস্যটা কী তা ধরবার জন্য আমি তার পোঁটলাপুঁটলি ঝোলা-ঝুড়ি ঘেঁটে দেখেছি বহু বার। আঁতিপাঁতি করে আশপাশের তত্ত্বতালাশ নিয়েছি। নদীর ধার, বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে বা টিলায়, সন্ধ্যায় বা সকালে সূত্রসন্ধান করে করে বয়স বাড়ল। আজও ধরা গেল না এই শরৎ নামক জাদুকরের লুকোনো তাসটা কী।
এই গোয়েন্দাগিরিটাই বা কেন তাও কি ঠিক মতো বুঝিয়ে বলতে পারব? যখন ছোট্টটি ছিলাম, তখনও বুঝতে পারতাম, বছরের এই একটা সময়ে আমি কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাই। শীত-গ্রীষ্ম চেনা হয়ে গেছে, বর্ষাকাল এলে তো মহা আনন্দ, সব ঋতুকেই চেনা লাগে, শুধু এই শরৎকে নয়। শরৎ আসবার একটু আগে থেকেই আমি সতর্ক ও নিঃশব্দ পদক্ষেপ ঠিক টের পেতাম। একটা অত্যাশ্চর্য রোমহর্ষ হত, কী একটা প্রত্যাশায় চনমনে লাগত। ভীষণ উন্মুখ, তৃষ্ণার্তের মতো অপেক্ষায় থাকতাম। ঠিক যেন আমার প্রিয় মিঠাইওয়ালা আসবে তার বাঁক ঘাড়ে করে। মস্ত মাটির গামলায় ঘোলের ওপর ননীর ডেলা ভাসিয়ে। সেই আধ পয়সা বা এক পয়সার এক-একটা ননীর ডেলা চিনি ছড়িয়ে মুখে দিলে গলা থেকে পেট অবধি সম্মোহনে মূক হয়ে যেত। শরৎকালও তাই। রসনা ছাড়াও যে অন্য কোনও তৃপ্তি থাকতে পারে, সেটার পাঠ বোধহয় আমাকে অবোধ বয়সে প্রথম দিয়েছিল ওই শরৎ নামক জাদুকর। নিপুণ রসায়নে সে মেঘের সঙ্গে রোদ্দুর মিশিয়ে দিত, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামিয়ে পট করে বৃষ্টির লাগাম টেনে এক ধামা রোদ্দুরের হিরে-মানিক ঢেলে দিত চার দিকে। আমি হতচকিত, দিশাহারা হয়ে যেতাম আর নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতাম, আমার মন এত ভাল লাগছে কেন? কেউ তো কোনও নতুন খেলনা বা গল্পের বই দেয়নি! আজ তো বাড়িতে পায়েস রান্না হচ্ছে না! আজ তো আমার সব অঙ্ক রাইট হয়নি! তা হলে কেন কেন কেন এত শিহরন হচ্ছে? কেন পাগলের মতো বাইরে বেরিয়ে দৌড়তে ইচ্ছে করছে? কেন মনে হচ্ছে আজ আমার ছুটির দিন?
প্রতি বছর ওই একটা সময়ে আমাকে পাগলামি পেয়ে বসত। মনে হত, আনন্দে ভিতরটা যেন ফাটো-ফাটো। (শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)
🐾🌾🍂 ছবিতে কানহা ন্যাশানাল পার্কের সংলগ্ন এক গ্রাম এলাকায় শরতের সন্ধ্যা।