14/08/2026
বর্ষার দেশে, জলপ্রপাতের কাছে. 🌿☘️💦🌧
দু’ বছর আগের কথা। বর্ষা তখন নিজের সমস্ত রং, গন্ধ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ছত্তীসগড়ের জঙ্গলে। আমরা তিনজন—আমি, আমার স্ত্রী আর আমাদের নয় বছরের ছেলে—বেরিয়ে পড়েছিলাম জগদলপুরের পথে।
বর্ষায় জগদলপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা অনেকেই শুনে অবাক হয়েছিল। কেউ বলেছিল, “এই সময়ে আবার জলপ্রপাত দেখতে যাবে? রাস্তা খারাপ থাকবে!”
কিন্তু আমরা জানতাম না, সেই বর্ষাই আমাদের জন্য এমন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দেবে, যার সৌন্দর্য শুকনো মরশুমের জগদলপুরের চেনা ছবির চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
শহর ছাড়ার পর যত এগোচ্ছিলাম, ততই বদলে যাচ্ছিল চারপাশ। কংক্রিটের জায়গা নিচ্ছিল লাল মাটির রাস্তা, আর রাস্তার দু’পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা শাল, সেগুন আর অচেনা গাছেরা যেন আমাদের নীরবে স্বাগত জানাচ্ছিল।
আকাশ সেদিন মেঘে ঢাকা। কখনও ঝিরঝির, কখনও ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছিল। গাড়ির কাচে জমে থাকা জলের ফোঁটার ওপারে সবুজটা যেন আরও সবুজ হয়ে উঠছিল।
আমাদের ছেলে জানলার কাচ মুছে বারবার বাইরে তাকাচ্ছিল।
“বাবা, আমরা কি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি?”
আমি হেসে বলেছিলাম, “হ্যাঁ। আর একটু পর থেকে এই জঙ্গলই আমাদের গল্প বলবে।”
সত্যিই বলেছিল।
জগদলপুরের কাছে পৌঁছতেই মনে হল, প্রকৃতি যেন হঠাৎ তার সমস্ত সৌন্দর্যের দরজা খুলে দিয়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য ছোট ছোট জলধারা, ভেজা পাথর, কুয়াশায় ঢাকা দূরের সবুজ পাহাড় আর বৃষ্টিতে চকচক করতে থাকা রাস্তা—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন কোনও পুরনো সিনেমার দৃশ্য।
আর সেই পথের শেষে ছিল আমাদের গন্তব্য—চিত্রকোট।
চিত্রকোট জলপ্রপাতের নাম আমরা অনেকবার শুনেছি। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখার অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম।
বর্ষার জল তখন ইন্দ্রাবতী নদীকে যেন উন্মত্ত করে তুলেছে। বিশাল জলরাশি পাহাড়ের কিনারা থেকে একসঙ্গে নেমে আসছে নিচে। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের বুক চিরে কেউ যেন সাদা ধোঁয়ার বিশাল পর্দা নামিয়ে দিয়েছে।
শব্দটা প্রথমে দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল—গম্ভীর, অবিরাম, অথচ অদ্ভুতভাবে মাদকতাময়।
আর কাছে যেতেই বোঝা গেল, সেটা শুধু জলপ্রপাতের শব্দ নয়।
সেটা যেন হাজার বছরের জলের গল্প।
চিত্রকোটের একেবারে কাছে পর্যটন অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ঘর থেকে বেরোলেই সামনে সেই বিশাল জলপ্রপাত। সন্ধ্যা নামার পর বৃষ্টি আরও বাড়ল।
আমরা বারান্দায় বসে ছিলাম তিনজন।
ছেলে চুপ করে জলপ্রপাতের দিকে তাকিয়ে।
স্ত্রী বলল, “এমন জায়গায় এসে মনে হচ্ছে, শহরের সব শব্দ যেন ভুলে গেছি।”
আমি কিছু বলিনি।
কারণ সত্যিই সেদিন কোনও কথা বলার প্রয়োজন ছিল না।
শুধু বৃষ্টির শব্দ, নদীর গর্জন আর চারপাশের অন্ধকারে ভেজা জঙ্গলের গন্ধ—এই তিনটিই যেন যথেষ্ট ছিল।
পরদিন সকালেই ঘটল আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাটি।
সকাল থেকেই আকাশ ভারী। আমরা ভাবছিলাম, এত বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া ঠিক হবে কি না। কিন্তু নয় বছরের ছেলের উৎসাহের কাছে শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তি হার মানল।
“চলো না! বৃষ্টিতে জলপ্রপাত দেখতে যাব!”
আমরা তিনজনই বেরিয়ে পড়লাম।
কিছুদূর যেতেই বৃষ্টি নামল প্রবলভাবে।
প্রথমে মাথার ওপর ছাতা ধরেছিলাম। তারপর কখন যে ছাতা বন্ধ হয়ে গেল, কেউ খেয়ালই করিনি।
আমরা তিনজনই ভিজতে শুরু করলাম।
ছেলের মুখে তখন এমন হাসি, যেন সে কোনও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভিযানে বেরিয়েছে।
“মা! দেখো, আমি পুরো ভিজে গেছি!”
স্ত্রী হেসে বলল, “তোর বাবাও তো!”
আমি তাকিয়ে দেখি—সত্যিই। জামাকাপড় ভিজে শরীরে লেগে আছে, চুল থেকে জল পড়ছে। অথচ আশ্চর্য, এতটুকু বিরক্তি নেই।
বরং মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টিটাই আমাদের ভ্রমণের অংশ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
চিত্রকোটের কাছে পৌঁছতেই বৃষ্টির পর্দার আড়াল থেকে জলপ্রপাতটা আবার দেখা দিল।
এবার আরও কাছে।
আরও বিশাল।
বর্ষার জলধারায় তার চেহারা যেন বদলে গেছে। অসংখ্য ধারায় ছুটে আসা জল একসঙ্গে নিচে পড়ে সাদা ফেনার পাহাড় তৈরি করছে। চারপাশের গাছপালা বৃষ্টিতে ধুয়ে চকচক করছে। বাতাসে জলকণা উড়ে এসে মুখে লাগছে।
ছেলে দু’হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি সেই দৃশ্যটা আজও ভুলিনি।
নয় বছরের একটা শিশু, মাথার ওপর কালো মেঘ, সামনে উন্মত্ত জলপ্রপাত, আর চারপাশে অসীম সবুজ।
সেদিন বুঝেছিলাম—ভ্রমণের সবচেয়ে দামী স্মৃতি কোনও দামী হোটেল, কোনও নিখুঁত ছবি বা কোনও বিখ্যাত জায়গা নয়।
কখনও কখনও একটা বৃষ্টিভেজা সকালই যথেষ্ট।
সেদিন বিকেলে অতিথিশালার বারান্দায় বসে আমরা আবার সেই জলপ্রপাত দেখছিলাম। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে অল্প আলো পড়েছে নদীর ওপর।
জলপ্রপাতের ওপরে হালকা কুয়াশা ভাসছিল।
আমাদের ছেলে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আমি আর আমার স্ত্রী চুপচাপ বসে ছিলাম।
সামনে চিত্রকোট।
পেছনে গভীর জঙ্গল।
আর মাঝখানে আমাদের ছোট্ট পরিবার।
হঠাৎ মনে হল, জীবনের আসল বিলাসিতা বোধহয় এটাই—একসঙ্গে থাকা, দূরে কোথাও চলে যাওয়া, আর প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য সব দুশ্চিন্তা ভুলে যাওয়া।
দু’ বছর কেটে গেছে।
জীবন আবার নিজের চেনা গতিতে ফিরে এসেছে। শহরের ব্যস্ততা, কাজ, দায়িত্ব—সবই আছে।
কিন্তু মাঝে মাঝে বৃষ্টির গন্ধ পেলেই আমার মনে পড়ে সেই রাস্তা।
মনে পড়ে ভেজা জঙ্গল।
মনে পড়ে ইন্দ্রাবতীর গর্জন।
আর মনে পড়ে নয় বছরের সেই ছেলেটার মুখ—যে সেদিন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে দু’হাত মেলে বলেছিল,
“বাবা, এমন জায়গায় আমরা আবার আসব তো?”
আমি সেদিন উত্তর দিয়েছিলাম—
“অবশ্যই আসব।”
কিন্তু মনে মনে জানতাম, আমরা হয়তো আবার চিত্রকোটে যাব।
আবার সেই জলপ্রপাত দেখব।
আবার বৃষ্টিতে ভিজব।
তবু সেই প্রথমবারের মতো মুহূর্তটি আর কোনওদিন ফিরে আসবে না।
কারণ কিছু ভ্রমণ জায়গায় নিয়ে যায়।
আর কিছু ভ্রমণ আমাদের জীবনের ভেতরেই একটা জায়গা বানিয়ে নেয়।
চিত্রকোট আমাদের জন্য ঠিক তেমনই একটি জায়গা হয়ে আছে—বর্ষায় ভেজা, সবুজে মোড়া, জলপ্রপাতের গর্জনে বেঁচে থাকা এক টুকরো স্মৃতি।
...