26/07/2026
এক দিনের মেদিনীপুর ভ্রমণ।
গতকাল দারুন একটা বেড়ানো হলো।সকাল বেলা তে ঘুম ভেঙে শান্ত মেদিনীপুর শহরের এক অন্য রূপ দেখলাম।ঠিক ছিল আজ প্রথমেই গোপগড় যাবো।ঘুরে আবার হোটেল এ ফিরে ব্রেকফাস্ট,স্নান সেরে পরবর্তী জায়গা গুলো তে যাবো।চটপট সবাই রেডি হলাম।বেড টি খেয়ে চললাম গোপগড় এর দিকে।মেদিনীপুর থেকে শালবনির দিকে একটু খানি গিয়েই গোপগড় এর রাস্তা।ঘড়ি তে তখন সকাল সাড়ে সাত টা।ঠিক আট টায় গেট খুললো।টিকিট কেটে ঢুকতে হলো।গোপগড় আসলে এখন একটা ইকো পার্ক এর মতো সাজানো।কথিত আছে মহাভারত এর বিরাট রাজার গড় এখানেই ছিল।যদিও সেসবের অস্তিত্ব আজ আর নেই।একটা খুব পুরোনো ইটের structure আছে।স্থানীয় গোপ রাজাদের ভাঙা গড়ের অংশ এটা।তখন কার বিপ্লবী দের আনাগোনা ছিল।সেও আজকে ভাঙা।ঢুকেই দারুন এক পরিবেশ পেলাম।2001 সালে এই ইকো পার্ক উদ্বোধন হয়েছে।প্রচুর গাছপালা,পাখি,প্রজাপতি দেখলাম।সকালের নরম আলোতে দারুন লাগছিলো হাঁটতে।আর এক পাশে দেখলাম প্রচুর সারি দিয়ে পাইন আর দেবদারু গাছ লাগানো।দেখে অবাক হলাম।এতো পুরো নর্থ বেঙ্গল,বা উত্তরাখন্ড বা হিমাচল বা কাশ্মীরের কোনো জায়গা মনে হচ্ছে।তারিফ করতেই হয় এত সুন্দর ভাবে সব কিছু maintain হচ্ছে।মেদিনীপুর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর অধীনে এটি।ভেতরে দু কামরার থাকার ঘর,ক্যান্টিন সব রয়েছে।উত্তম ব্যবস্থা।আগে থেকে বুক করে থাকাও যায়।খুব ভালো লাগলো।সকালের এই non poluted বাতাস আর সূর্যের আলো।এখানে পিকনিক করার ও ব্যবস্থা আছে।মরসুম শুরু হচ্ছে তাতেই দেখলাম পিকনিক এর জন্য এক পার্টি।তবে পিকনিক এরিয়া গুলো বেশ নোংরা।এদিকে অবশ্যই কতৃপক্ষ এর নজর দেয়া উচিত।খুব ভালো সকাল সকাল এক বুক অক্সিজেন ভরে এবার আমরা বেরিয়ে এলাম। এবার হোটেল এ ফিরে এলাম।ধীরে ধীরে রবিবার এর বাজার জমে উঠছে।ফিরে ব্রেকফাস্ট সারলাম।সরকারি হোটেলের ব্যবস্থাপনায় লুচি,সবজি,ডিম,মিষ্টি,কলা আর চা দিয়ে দারুন সূচনা হলো।সবাই স্নান করে রেডি হয়ে এবার একটু পা চালিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।এবারের গন্তব্য কর্ণগড়।কর্ণগড় এ দুটি জায়গা।একটি কর্ণগড় এর মহামায়া temple কমপ্লেক্স আর দ্বিতীয় টি কর্ণগড় এর ধ্বংসাবশেষ।টিকিট কেটে মন্দির কমপ্লেক্স এ ঢুকলাম।এখানে মূল মন্দির দুটি।মহামায়া মন্দির আর অনাদিলিঙ্গ দণ্ডশ্বর মন্দির।মন্দির কমপ্লেক্স টা খুব সুন্দর,একেবারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।দারুন maintain.খুব বিখ্যাত আর জাগ্রত মন্দির বলে স্থানীয় বিশ্বাস।প্রচুর লোকজন এসেছেন পুজো দিতে।আর জায়গাটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও খুব।কাছেই কর্ণগড় দুর্গের ধ্বংসবশেষ।সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগলো।এখানেও থাকার সুব্যবস্থা আছে।
এবার চললাম কর্ণগড় দুর্গের ধ্বংসবশেষ দেখতে।এরও প্রাচীন ইতিহাস আছে। আসে পাশের আদিবাসী ( যারা মেদিনীপুর,মানভূম,বাঁকুড়া,সিংভূম এলাকা তে থাকতেন ) তারা স্থানীয় জমিদার বা রাজাদের কাছে শ্রমের বিনিময়ে জমি পেতেন।এবার ব্রিটিশ সরকার ঐ সব জমির ওপরে রাজস্ব আদায় এর জন্য সক্রিয় হলো।তাতেই বিদ্রোহ শুরু হলো।এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো।বিভিন্ন জায়গাতে এই বিদ্রোহ কঠোর ভাবে দমন করা হতে লাগলো।এই বিদ্রোহ কে চুয়ার বিদ্রোহ বলা হয়।কর্ণগড় এ তখন রাজা ছিলেন অজিত সিং।রাজা নিঃসন্তান ছিলেন।তার দুই রানী ছিল।রানী ভবানী আর ছোট রানী শিরোমনি।রাজার মৃত্যুর পর রানী শিরোমনি নেতৃত্বে আসেন।তিনি নাড়াজোল রাজ ত্রিলোচন সিংহ এর সহায়তায় স্থানীয় কৃষক দের নিয়ে ব্রিটিশ দের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।প্রথম দিকে সাফল্য পেলেও ব্রিটিশ দের হাতে তিনি পরাজিত হন এবং তাকে বন্দি করা হয়।পরে বন্দি অবস্থায় তিনি মারা যান।এবং চুয়ার বিদ্রোহ ধীরে ধীরে দমন হয়ে যায়।এই কর্ণগড় এর দুর্গের এটাই ইতিহাস।আজ বেশির ভাগ ই ধ্বংস প্রাপ্ত।কিছু কিছু অংশ টিকে আছে।তবে আশার কথা এই যে সরকারি উদ্যোগে কিছু জায়গা renovation হচ্ছে।ভেতরে থাকার জায়গা আছে।তবে দুর্গে ঢোকার রাস্তা বেশ সরু।এটা দেখা দরকার।দুর্গের ভেতরে বিশাল একটা ঝিল আছে।মাঝখানে পুরোনো একটা ইটের ধ্বংসবশেষ আছে ওটা পুরোনো অংশ।দুর্গের সামনে দিয়ে পারাং নদী বয়ে চলেছে।রানী শিরোমনি 1820 সালে মারা যান।আবাসগড় বলে একটা জায়গায়।ওখানেই ওনাকে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল।ভাবতে অবাক লাগে রানীর এই সংগ্রাম একদম ই ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এর মতো।আজ এই দুর্গ ধ্বংসস্তূপ বটে কিন্তু এই পবিত্র ভূমি তে এসে শ্রদ্ধায়,মাথা নত করে দাঁড়াতেই হবে আমাদের।জানতেই হবে এই সুদীর্ঘ ইতিহাস।
কর্ণগড় দেখে এবার যাবো পাথরা।