01/09/2019
#কলিঙ্গ_বিজয়
#কলিঙ্গ_বিজয়
" কুয়াডে যাউছ?! কাহাকু জানেইকি সেথিকি যাউছ? কিয়ে তুমকু পঠেইচি? গাঁও লোক কু কাহিদেবি, না শুনিবা যদি লোক আসিবে , মুন্ডা কটিদেবে!! "
বক্তা - সুক্রু মাঝি , জনৈক মালিপাদার গ্রামের বাসিন্দা একটু আগেই যে গ্রাম টাকে পাহাড়ের ওপর সমতল জায়গায় ফেলে এসেছি|
কথা শুনে বুঝলাম এবার তো বিপদ | দিব্যি দিনকতক উড়িশ্যার এই প্রত্যন্ত পাহাড়ী জঙ্গুলে এলাকায় এক পাহাড় বেয়ে টুকটুক করে নেমে আরেক পাহাড় চূড়ায় যাচ্ছিলাম, মাঝখান থেকে এ কি জ্বালা! মনে মনে অবিশ্যি খুশি ই হোলাম | এই দুপুর রোদ এ দু বার করে পাহাড় ভাঙবার কোনোই অভিপ্রায় ছিলোনা আমার, কিন্তু স্যার এর দাবি যেতেই হবে পাথর দেখতে| (এই খানে বলে রাখি, পেশায় আমি ভূতত্ত্ববিদ, অর্থাৎ কিনা জলে-জঙ্গলে পাহাড়ে পর্বতে মাটির তলায় মাটির নিচে রাস্তার ধারে বাড়ীর পিছনে পাথর খুঁজে যেতে হবে আর পেলেই তার উপরে শুয়ে পড়ে পড়াশুনা আরম্ভ করে দিতে হবে, গ্রামের লোকজন দেখে হাসে, ভাবে যে শহুরে বাবুরা সব সাধ করে জঙ্গলে এসে পাথরের ওপর গড়াগড়ি খায় কেন?!) যাকগে, এসব বলতে নেই, এটাই আমার কাজ অর্থাৎ স্যারের ভাষায় -'This is your bread and butter' -হক্ কথা, অতএব গত এক মাস ধরে উড়িশ্যার এই মালভূমি অঞ্চলে আলুমিনিয়ামের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছি| এখানে সব পাহাড়ী জঙ্গল, কোথাও ঘন জঙ্গল পাহাড়ের মাথায় , কোথাও বা ফাঁকা মাঠ, যেমন হাওয়া তেমনি হঠাৎ বৃষ্টি|
যাই হোক, উল্টো দিকের পাহাড়ের মাথায় সুক্র যেরকম হাতপা ছুড়তে আরম্ভ করেছে তাতে একরকম বাধ্য হয়েই নামতে আরম্ভ করলাম, আমরা, আমি তো খুশি , সেই সকাল আট টা থেকে পাহাড় বাইছি, এখন বাজে দুপুর দুটো, আর ভাল্লাগেনা বাপু! আমার উড়িয়া পার্টনার অভিলাস ও বলল,"আও চালি পারিবিনি, বহত ভুখো লাগুচি! আসো বসি খাইবা"| সবে মাত্র বৃষ্টি থেমেছে| ঘড়িতে দেখলাম আড়াইটে বাজছে| সেই সকাল আট টা থেকে পাহাড়ের এমাথা থেকে সেমাথা করে বেড়াচ্ছি| ওর কথায় এতক্ষনে খিদেটাও চাগার দিয়ে উঠেছে| সকালে স্রেফ চিড়ে জলে ভিজিয়ে খেয়ে বেড়িয়ে গেছিলাম| অতএব বসা যাক| ততক্ষণে অভিলাস আর সিলু থেবড়ে বসে পড়েছে হাতুড়ি কম্পাস ব্যাগ ছড়িয়ে রেখে| পত্রপাঠ বেড়িয়ে এসেছে টিফিন বক্স| আমিও আর দেরী না করে শুরু করে দিলাম| ঢাকনা খুলতে যেটা বেরোলো সেটা চট করে মুখে দিতে বুঝলাম হতভাগা রাঁধুনী টা একটি ফোঁটাও নুন দেয়নি| আর এটা কী বানিয়েছে?! না ভাত না পোলাও না খিচুড়ি - আইডিয়াল জগাখিচুড়ী | তেল কম দিতে বলায় বোকাটা তেল তো বটেই নুন ও দেয়নি|
ওদের ও মুখ দেখে বুঝলাম এই শুকনো ভাত ওদেরও গলা দিয়ে নামছেনা| দেখে করুণা হলো| একটা ' হাইক্লাস' হাসি দিয়ে বললাম চিন্তা করিসনি, বলেই ব্যাগ থেকে বের করলাম কুরকুরের প্যাকেট আর একটু কাঁচা পেয়াজ| ব্যাস! সামনে বৃষ্টি ভেজা পাহাড় আর পেছনে ঘন বন - মাঝখানে পাহাড়ের ধরে পা ঝুলিয়ে শুরু হলো আমাদের 'জিভে প্রেম'।
এই তালে উল্টোদিকের পাহাড় থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে এসেছে সুক্রু| রোগা ক্ষয়াটে ধরনের চেহারা, আর এই দুপুর রোদেই হাঁড়িয়া টেনে এসেছে| প্রবল আস্ফালন আর চরম কটু দুর্গন্ধ মিশ্রিত দুর্বোধ্য গ্রাম্য উড়িয়া ভাষায় (অভিলাস দোভাষীর কাজ করছিল)জানা গেলো তার আপত্তির কারণ। বছর কয়েক আগে অন্য কোন এক কোম্পানি এখানে কাজ করতে গিয়ে গ্রামের লোকেদের সাথে বেশ ঝামেলা বাধিয়েছিল- সেই জন্যই আপত্তি| গ্রামের আরো দুই রমণী পাহাড়ের জঙ্গলে শুকনো কাঠ তুলতে এসেছিল, তারাও সুক্রুর কথায় সায় দিচ্ছিল| আমরাও টিফিন খেতে খেতে তাদের বক্তব্য শুনলাম| হতভাগা সুক্রু কে আমাদের খাবার থেকে একটু ভাগ দিয়েছিলাম, চেটেপুটে খেলো, যাওয়ার আগে আবার শাসিয়ে গেল | আমরাও কেটে পড়ার তাল করলাম| ওই ভদ্রমহিলা দুজন তখনো মাথার বোঝা নামিয়ে বসে গল্প গুজব করছিল । ঘরোয়া সমস্যা । জানতে পারলাম যে ওনার বড় ছেলেও সেবারে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে বিনা দোষেই জেল খেটে এসেছিল। সেই থেকেই তাদের ভয় | যাকগে আমরাও কেটে পড়ার তাল করলাম| পাহাড় থেকে নামার সময় আমি একটু হড়কে যাচ্ছিলাম, তাই দেখে মহিলা দুজনের কি হাসি, একটু চটলাম, পরক্ষণেই ভাবলাম এদের আর কী, আমরা তো চলেই যাব, ফিরে যাব নিজেদের ঝকমকে শহরে, এনারা রোজ তিন বেলা করে পাহাড় চূড়ায় উঠবে আর নামবে, শুকনো কাঠ তুলতে তা সে রোদ ঝড় বৃষ্টি যাই ই হোক না কেন|
ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম এইত্ত ফিরলেই মায়ের ফোন আসবে-' ঠিক করে খাচ্ছিস তো? শরীর ঠিক আছে তো? ফিল্ড এ কোনো সমস্যা হয়নি তো? ইত্যাদি ইত্যাদি'
নামতে শুরু করার আগে আরেকবার পিছন ফিরে চাইলাম, মেঘ কেটে এসেছে, বেলাও পড়ে এসেছে...
মহিলা দুজন কাঠ কুড়িয়ে বসে বসে গল্প করছেন- ছেলে আজ দেশি মুরগী এনেছে, রাতে জব্বর রান্না হবে ।
©অনির্বাণ সরকার Anirban Maximus Sarkar