26/02/2022
ডুয়ার্স এলাকায় পর্যটন জনপ্রিয় করার প্রতিবেদন
গৌতম চৌধুরী
প্রোঃ ট্রিপ ইনক্ড,
প্রধাননগর, শিলিগুড়ি
আমার বেড়ে ওঠার জায়গা এই ডুয়ার্স। আমার স্কুল জীবন কেটেছে আলিপুরদুয়ার আর মালবাজারে। তারপর কিছুদিন কলেজ শিক্ষায় উত্তরবঙ্গের বাইরে চলে যাওয়া। চাকরী জীবনের শুরুটা কলকাতায় তারপর চাকরী পরিবর্তন করে আবার সেই উত্তরবঙ্গ। গ্রামীণ ব্যাঙ্কে চাকরী করার কারণে আমাকে জড়িয়ে থাকতে হয়েছিল গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। নানান ধরণের গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মোদ্যোগকে অর্থ যোগান দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল আমার কাজ। কর্মসূত্রে গ্রামীণ অঞ্চলের আনাচে কানাচে হাজার ধরণের গ্রামীণ কর্মোদ্যোগ দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছিল পর্যটন নিয়ে এখানে সুন্দর গ্রামীণ কর্মোদ্যোগ গড়ে তোলা যায়। সরকারীভাবে বা ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এই সম্ভনাময় উদ্যোগের প্রতি তেমন গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। এখানে চারিদিকে পর্যটনের প্রচুর আকর ছড়িয়ে আছে কিন্তু তা সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। ঠিক এ কারণে ২০১৫ সালে চাকরী থেকে অবসরের পর এ অঞ্চলের পর্যটনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। একমাত্র উদ্দেশ্য এসব এলাকায় গ্রামীণ জনগনের মধ্যে অর্থকরী কর্মোদ্যোগ গড়ে তোলা পর্যটনের মাধ্যমে।
এই আলোচনার শুরুতে পর্যটন নিয়ে সাধারণ কিছু ধারনা গড়ে নেওয়া দরকার। পর্যটন হলো একটি শিল্প। একটি শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে যেমন একাধিক কর্মীর প্রয়োজন হয় ঠিক তেমনি পর্যটন শিল্পও একাধিক ব্যাক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে। প্রতিটি শিল্পের যেমন একটি ব্যাক লাইন এবং একটি ফরওয়ার্ড লাইন থাকে এক্ষেত্রেও এই দুই লাইনের সঠিক সমন্বয়ে শিল্প সার্থক হয়ে ওঠে। শিল্পে ব্যাক লাইনে থাকে উৎপাদন পদ্ধতি এবং উৎপাদিত বস্তু। শিল্পকে সার্থক করে তুলতে মূল শিল্পের সঙ্গে গড়ে ওঠে কিছু অনুসারী শিল্প। আর ফ্রন্ট লাইনে থাকে উৎপাদিত বস্তুর বাজার। পর্যটন শিল্পেও ব্যাকলাইনে থাকে হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টে ইত্যাদি। অনুসারী শিল্প হিসাবে থাকে পরিবহণ, ট্যুর গাইড, পর্যটকদের খাওয়ার জোগানোর জন্যে কৃষি এবং কৃষিজ কর্মোদ্যোগ, তাদের মনোরঞ্জনের জন্যে আঞ্চলিক লোকংস্কৃতির অনুষ্ঠান বা হস্তশিল্পের উৎপন্ন সামগ্রীর আমদানী। এ শিল্পের সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো স্বল্প মূলধন বিনিয়োগে প্রচুর কর্মসংস্থান করা সম্ভব। পরিবহণে ছোট গাড়ির প্রসার হতে পারে।
এ শিল্পের ফ্রন্ট লাইনে আছেন ভ্রমণকারী বা পর্যটকেরা। এরাই হলেন এ শিল্পের মূল লক্ষ্মী। যতবেশী পর্যটক আকর্ষণ করা যাবে তত এ শিল্প সমৃদ্ধ হবে। কোবিড পরিস্থিতির আগে পুরো সিকিম রাজ্যে এবং উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলাতে বার্ষিক পর্যটক আগমনের পরিসংখ্যান তিন লক্ষের কাছাকাছি ছিল এবং এ সংখ্যা সমানে ঊর্ধ্বমুখী। কাজেই এ শিল্প ভীষণ সম্ভনাময় এ এলাকায়। এ শিল্পের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় স্থানীয় বাসিন্দা অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল।
এখানে একটা কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে তা হলো ডুয়ার্সে পর্যটনের মূল আকর্ষণ হলো প্রকৃতি। কাজেই যে উদ্যোগই গড়ে তোলা হোক এখানে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতেই হবে। তাই স্থানীয় গ্রামীণ জনগণের সংগঠিত হয়ে নজর রাখা প্রয়োজন প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে কোন হোটেল বা রিসর্ট গড়ে যেন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা না হয়। একটা প্রবণতা আজকাল লক্ষ্য করা যাচ্ছে যত্রতত্র হোমস্টের নামে একধরণের হোটেল গড়ে উঠছে, সরকারী বাধা নিষেধকে উপেক্ষা করার জন্যে। এ প্রসঙ্গে হোমস্টে কথাটার অর্থ পরিষ্কার হওয়া খুব জরুরী, ‘হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’ বা বাংলায় যা ‘বাড়ির বাইরে বাড়ি’ । সরকার গ্রামীণ জনগনের অল্টারনেটিভ সোর্স অফ ইনকামের একটা ব্যাবস্থা করার জন্যে অফবিট এলাকায় এই হোমস্টে কনসেপ্টের আমদানি করেছেন। বিদেশে অনেকদিন আগেই এ ব্যাবস্থা চালু হয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশে পথ দেখিয়েছে কেরাল রাজ্য। আমি বিগত শতাব্দীর নয়ের দশকে কেরালার পেরিয়ারে এই ব্যাবস্থায় থেকে এসেছি। এই কনসেপ্টে বলা হচ্ছে ঘরের মালিক তার নিজস্ব ঘরগুলোর সঙ্গে বাড়তি কিছু ঘর রাখবেন যা বিনিময়মূল্যের মাধ্যমে পর্যটকদের থাকা, খাওয়ার জন্যে ব্যাবহৃত হবে। অবশ্যই বাড়ির মালিককে সেইসব ঘরের সঙ্গে থাকতেই হবে। কিন্তু আমাদের এখানে দেখা যায় বাইরের লোকেরা স্থানীয় লোকের নামে হোমস্টে গড়ে বড় বড় ব্যাবসা ফেঁদে বসেছে। যেগুলো ভীষণভাবে প্রকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করে চলেছে। যাঁরা হোমস্টে করছেন তাঁরা চেষ্টা করুন রাজ্য বা কেন্দ্রিয় পর্যটন দপ্তরের তালিকাভুক্ত হতে এতে ওদের ওয়েবসাইটে হোমস্টের নাম দেখা যাবে। তাতে পর্যটকদের কাছে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক চিকিৎসার কিছু ব্যবস্থা রাখতেই হবে। যাতে অবস্থা কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।
এবার আসি পরিকাঠামো উন্নয়নের কথায়। পর্যটনে এ কাজটি করার দায়িত্ব সরকারের। এরমধ্যে পড়ে যোগাযোগ ব্যাবস্থা, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল। যোগাযোগ ব্যাবস্থায় আসে রাস্তাঘাট এবং নেট কানেকশন। যে এলাকায় রাজ্য সরকার এ ব্যাপারে যতবেশি সক্রিয় সে এলাকার পর্যটন শিল্প ততবেশি উন্নত। তবে আলিপুরদুয়ার যেহেতু একটি নতুন জেলা এখানে গ্রামীণ উন্নয়নের প্রতি সরকারের একটি বিশেষ দৃষ্টি থাকার কথা। এ ব্যাপারে ডি.আর.ডি.এ.র সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নিয়ে গেলে কিছু সুরাহা হওয়ার সম্ভবনা আছে। এগুলি সঠিক ভাবে গড়ে উঠছে কিনা তার একটা সূচক আছে। যে অঞ্চলে বিদেশী পর্যটক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় বুঝতে হবে সে অঞ্চলের পর্যটন ব্যবস্থার পরিকাঠামো ভালো।
পর্যটকদের আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগে নিছক ভ্রমণকারী যাঁরা তাঁদের আমোদের কারণে ভ্রমণ করেন। এই শ্রেণীর ভ্রমণকারী নিয়ে একটু আতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় কারণ তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ান। যেহেতু যে কোন শিল্পে তার সামগ্রী বাজারীকরণের ক্ষেত্রে ক্রেতার বাছ বিচার করা হয়না এক্ষেত্রেও সব ধরণের ভ্রমণকারীই স্বাগত। শুধু এঁদের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে বাধ্য করাতে হবে যাতে প্রকৃতির ভারসাম্যে কোন অসুবিধে নাহয়। সাধারণতঃ এঁদের কাছ থেকে যে দূষণ হয় তা হলো যত্রতত্র আবর্জনা নিক্ষেপ আর শব্দ দূষণ।
দ্বিতীয়ভাগে আছেন পর্যটক। যাঁদের নিয়ে এসব ভাবনার কোন অবকাশ নেই কারণ এই শ্রেণীর ভ্রমণকারীরা অত্যন্ত সচেতন। তাঁরা যে পথ দিয়ে যান তাঁদের ভাললাগা সমস্ত কিছু পর্যবেক্ষণ করতে করতে যান। অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার অপার কৌতূহল নিয়ে এঁরা পথ চলেন। আমাদের এ এলাকায় এতো পছন্দের বিষয় রয়ে গেছে তা অনুসন্ধান করতে গেলে অল্প সময়ে হয়না। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান তো রয়েছেই তাছাড়া ফুল, প্রজাপতি, পাখি, জীবজন্তু। বিভিন্ন জ্ঞানচর্চার বিষয় রয়ে গেছে যা থেকে উৎসাহী পর্যটক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। যেমন জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূতত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজতত্ব এবং আরও আনেক কিছু। মানুষ ভীষণ বৈচিত্রপিয়াসী। তা ছাড়া একটা যাযাবর প্রবৃত্তি আমাদের জিনে রয়ে গেছে। আদিম বন্য জীবনে আহার সংগ্রহের জন্যে মানুষকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় টেনে নিয়ে গেছে। সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষ চাষ আবাদ শেখার পর স্থায়ী বসবাসে অভ্যস্থ হয় কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওই যাযাবর প্রবৃত্তি রয়েই গেছে যা আমাদের ভেতর পর্যটনের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। আমরা বারে বারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
ভারতের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে পর্যটকের একটা বড় ভূমিকা রয়ে গেছে। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম মেগাস্থিনিস, হিউ-এন-সাং, আলবিরুনি, ইবনবতুতা। মানুষের এই প্রবৃত্তিগুলো অন্বেষণ করে পর্যটন শিল্পের এই ফরওয়ার্ড লাইনকে শক্তিশালী করে গড়ে নেওয়া যায়। তাই সব বৈচিত্রের সন্ধান পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। অ্যাডভেঞ্চারপিয়াসী অনেক পর্যটক আছেন। এ বিষয়ে ডুয়ার্স এক স্বর্গরাজ্য। তার সন্ধান তাঁদের দিতে হবে। আজকে যুব সমাজের একটি অংশ যাঁরা কর্পোরেট কর্মে নিযুক্ত তাঁরা দল বেঁধে ট্রেকিংয়ে খুব উৎসাহী। তাঁদের সে বিষয়ে সুবন্দোবস্ত করে দিতে হবে। নিরন্তর যোগাযোগের মাধ্যমে ফরওয়ার্ড লাইনকে চালু রাখতে হবে। এই শিল্পে যোগাযোগই যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া আজকের দিনে এই যোগাযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম আজকের দিনে খুবই কার্যকরী। এছাড়া ভ্রমণ পত্রিকাগুলো ব্যাবহার করা যেতে পারে তা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই হোক অথবা প্রিন্ট মিডিয়া। এখানে বিভিন্ন জায়গা ধরে ছোট ছোট ভ্রমণকাহিনী ছবিসহ প্রকাশ করতে হবে। একাজে সরকারী সংস্থাগুলোরও বিশেষ দায়িত্ব রয়ে গেছে। যেমন রাজ্য ও কেন্দ্রের পর্যটন বিভাগ, ইনক্রেডিবল্ ইন্ডিয়া, রাজ্যের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগ, রাজ্য গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগ ইত্যাদি। এই সংস্থাগুলির নিরন্তর বিজ্ঞাপন পর্যটক আকর্ষণে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে।
আর একটা জিনিস খুব নজর দেওয়া জরুরী তা হোল প্যাকেজ মূল্য। এর একটা স্ট্যান্ডার্ড রেট তৈরি করা উচিত যাতে পর্যটক মনে না করেন তাঁরা ঠকে যাচ্ছেন। আমাদের অঞ্চলে এই স্ট্যান্ডার্ড রেটের খুব অভাব। পিক সিজনে যে যেভাবে পারেন পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে নেন। এ অভিযোগ প্রতি বছরই সংবাদপত্রে আমাদের নজরে আসে। খুব দুঃখজনক ঘটনা পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে। এর অবসান ভীষণ জরুরী। যে কোন শিল্প গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোক্তাদের তার সাসটেনেবিলিটির(স্থায়িত্ব) দিকে নজর দেওয়া খুব জরুরী। বিশ্বস্ত সার্ভিস আর তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিনিময় মুল্যের ওপর পর্যটন শিল্পের সাসটেনেবিলিটি নির্ভর করে। পশ্চিমবাংলার বাইরে যদি পর্যটক সংস্থাগুলি এ ব্যাবস্থা করতে পারে তবে এখানে আমরা কেন তা পারব না! যদি সব হোমস্টে, রিসর্ট, হোটেল মালিকেরা, গাড়ির মালিকেরা বা অন্যান্য সার্ভিস প্রদানকারী ব্যাক্তিরা মিলে একটা শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেন তবে আমার মনেহয় একাজ করা সহজসাধ্য। সংগঠন শক্তিশালী হলে পরিকাঠামো উন্নয়নেও সরকারের কাছ থেকে দাবীদাওয়া আদায় করা অনেক সহজ হবে। আধুনিক ব্যাবসার নিয়ম হলো লাভের পরিমান কম করে বিক্রি বাড়ানো যাতে গ্রস প্রফিটকে বাড়িয়ে নেওয়া যায়।
মানুষ যেহেতু বৈচিত্র খুঁজে বেড়ায় তাই ডুয়ার্সকে প্রোজেক্ট করতে হবে সেইভাবে। ডুয়ার্স মানে শুধুমাত্র পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান ঘেরা একটা জায়গা, যদি শুধু এই বার্তা পর্যটকদের কাছে যায় তবে ডুয়ার্স ভ্রমণ সারা বছরে শুধুমাত্র একটা বা দু’টো সিজনে আটকে থাকবে। যে সময় জঙ্গল বন্ধ থাকে সে সময় পর্যটক বেড়াতে আসায় আনীহা প্রকাশ করবেন। সেক্ষেত্রে পর্যটকের অপ্রতুলতায় ব্যাবস্থাপকদের নিজেদের মধ্যেই অসম প্রতিযোগিতা হতে থাকবে এবং এই শিল্পের সাসটেনেবিলিটি নষ্ট হওয়ার সম্যক সম্ভবনা থেকে যাবে। প্রচারের নানাদিক ধরে এ অঞ্চলের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে হবে। যেমনঃ
১) ডুয়ার্স এমন একটা জায়গা যেখানে বছরের ছয়টা ঋতুকেই উপভোগ করা যায়। আলাদা করে ঋতু বৈশিষ্ঠগুলো প্রকৃতির মাঝে দৃশ্যমান হয়। নানান ঋতুতে প্রকৃতির পরিবর্তনটা কিভাবে আমরা উপলব্ধি করি তা প্রচারের মাধ্যমে বর্ণনায় চিত্রিত করা প্রয়োজন। যাতে পর্যটকেরা মানসচক্ষে উপলব্ধি করতে পারেন সেই সৌন্দর্য এবং তাদের কৌতূহল যেন তাদেরকে বারে বারে টেনে নিয়ে আসতে পারে এই সোন্দর্য উপভোগে। এমন কি বর্ষাকাল উপভোগ করার জন্যে তখন পর্যটকের অভাব হবে না।
২) এ অঞ্চলের বিপুল জনবৈচিত্র্যের হদিস দেওয়া দরকার। তাঁদের বিচিত্র শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি একটা টান পর্যটকদের মধ্যে তৈরি করতে হবে। তাতে ওঁদের একটা আয়েরও পথ হয়ে যেতে পারে। এরমধ্যে অবশ্যই হস্তশিল্পও পড়বে। এ প্রসঙ্গে আমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০১৯র ডিসেম্বর মাসে ভিয়েতনাম বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে সায়গন এবং হ্যানয়ে আমরা হোমস্টেতে ছিলাম। দু’টো জায়গাতেই দেখলাম আঞ্চলিক হস্তশিল্পের সরঞ্জাম দিয়ে ঘর সাজানো। এ উদ্যোগ অবশ্যই রুচিশীল পর্যটককে আকর্ষণ ও উৎসাহিত করবে তার কিছু স্মৃতি নিজের সংগ্রহে রাখতে। এতে তৈরি হতে পারে সেসব হস্তশিল্পের বাজার, উপকৃত হবেন প্রত্যন্ত এলাকার লোকশিল্পীরা।
৩) বিচিত্র জনজাতির পরম্পরাগত বৈচিত্র্যপূর্ণ নিজস্ব পোষাকে লোকনৃত্য খুব আকর্ষণীয় হতে পারে। এ ব্যাবস্থা লাটাগুড়ি বা পাহাড়ে কোথাও কোথাও করতে পারলেও ডুয়ার্সের সব জায়গায় তা করে তোলা যায়নি। এটা পর্যটক আকর্ষণের একটা বিষয় যেমন হবে আবার স্থানীয় শিল্পীদের উপার্জনেরও একটা দিক খুলে যাবে। ভিয়েতনামে হন থম দ্বীপের রিসর্টে এমন ব্যাবস্থা করেছিলো যা আমাদের কাছে খুব উপজীব্য ছিল। ওঁদের পেমেন্টের ব্যাবস্থা আমাদের প্যাকেজ কস্টের মধ্যেই ধরা ছিল। এখানে পাশাপাশি কয়েকটি হোমস্টে যৌথভাবে সন্ধ্যের পর এমন ব্যাবস্থা করতেই পারে।
৪) সারা বছরভর পর্যটকদের নানান অ্যাক্টিভিটির মধ্যে রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে যাতে বেড়াতে এসে তাঁরা কোন একঘেঁয়েমির শিকার না হন। সকালে ওঠা থেকে একেবারে রাতে ঘুমতে যাওয়া পর্যন্ত। তাঁরাই ঠিক করে নেবেন কোন অ্যাক্টিভিটিতে অংশ নেবেন আর কোন অ্যাক্টিভিটিতে অংশ নেবেন না। যদি অ্যাক্টিভিটির মধ্যে পর্যটকদের আটকে রাখা না যায় তবে অলস মস্তিষ্ক থেকে কিছু অনভিপ্রেত কাজকর্ম হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থেকে যায়।
৫) ডুয়ার্সের অন্যতম আকর্ষণ চা বাগান। একটা সারাদিন কোন একটা চা বাগানে কাটানোর সমস্ত উপকরণ তুলে ধরা যায়। একেবারে বৃক্ষ রোপন থেকে তার নার্সিং, প্রসেসিং এবং মার্কেটিং। জনপ্রিয় করে তোলা যেতে পারে চা বাগান শ্রমিক এবং বাবুদের জীবন বৈচিত্র।
তরাই অঞ্চল হোল নিম্ন হিমালয়ের সেই এলাকা যেখানে পাহাড় এসে সমতলে মিশেছে। এলাকার বৈশিষ্ঠ খরস্রোতা নদী আর বিস্তীর্ণ বনভূমি। ভৌগলিক সীমারেখা হিসেবে আমাদের দেশে তরাই এলাকা হোল পশ্চিমে যমুনা নদী থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত। হরিয়ানা, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, নেপাল, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম রাজ্য জুড়ে এই তরাই অঞ্চল। তরাই অঞ্চলের একটি অংশ ডুয়ার্স নামে পরিচিত। পশ্চিমে তিস্তা নদী থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত। ডুয়ার্স বলার কারণ অতীতে মোট ১৮টি পথ দিয়ে এ অঞ্চল থেকে ভুটানে যাওয়া যেত। পশ্চিম ডুয়ার্স বা পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্স হোল তিস্তা নদীর পূর্ব পাড় থেকে সঙ্কোশ নদী পর্যন্ত আর তারপরের অংশটি পূর্ব ডুয়ার্স বা আসাম ডুয়ার্স। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের ভ্রমণ মানচিত্র আমার মনেহয় তিনটে ভাগ করে নিলে পর্যটকদের ভ্রমনে যেমন সুবিধে হবে তেমনি ডুয়ার্স পর্যটক ব্যাবস্থাপকদেরও সুবিধে হবে। তিস্তার পূর্ব পাড় থেকে ডায়না নদী পর্যন্ত এলাকাকে পশ্চিম ডুয়ার্স যার ভেতর ইয়েল্বং, চুইখিম, নিম্বং, চারখোল, পাবং, সিনজি, সামথার, লোলেগাঁও, রিশপ, লাভা, কোলাখাম, পাঁপড়ক্ষেতি, ঝান্ডি, মণ্ডলগাঁও, সুনতালেখোলা, সামসিং, কুমাই, রঙ্গো, গোদক, তোদে, তাংতা, বিন্দু, জলঢাকা, মূর্তি, ধুপঝোরা,গরুমারা, টিলাবাড়ি, লাটাগুড়ি, রামসাই ইত্যাদি জায়গাগুলোকে টুরিস্ট স্পট হিসাবে যুক্ত করা যায়। তবে এ অংশে কালিমপঙ জেলার জায়গাগুলো মোট তিনটে সার্কিটে ভাগ করা যেতে পারে। এরপর ডায়না নদী থেকে তোর্ষা নদী পর্যন্ত সেন্ট্রাল ডুয়ার্স যার ভেতর চামুর্চি, সেন্ট্রাল ডুয়ার্স চা বাগান, সামচি, মাকড়াপাড়া, বান্দাপানী, টোটোপাড়া, জলদাপাড়া, মাদারীহাট, কুঞ্জনগর, ছোট শালকুমারকে প্রোজেক্ট করা যায়। তারপর তোর্ষা নদী থেকে শংকোষ নদী পর্যন্ত অঞ্চলকে পূর্ব ডুয়ার্স হিসেবে ধরে ফুন্টসোলিং, পাশাখা, মালঙ্গী, কোদালবস্তি, রায়মাটাং, বক্সা, লেপচাখা, জয়ন্তী, ভুটিয়াবস্তি, আঠাশমাইল, সিকিয়াঝোরা, ভুটানঘাট, চুনিয়াঝোরা, ফাঁসখাওয়া, কুচবিহার, বানেশ্বর, গোঁসানীমারী ইত্যাদি জায়গাগুলি এখানে যুক্ত করা যায়। এছাড়া আরো অনেক অনাবিষ্কৃত জায়গাকে ভবিষ্যতে যুক্ত করা যাবে।
এই জায়গাগুলোতে পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী পাঁচ রাত/ছয় দিনের ছোট ছোট ভ্রমণ সার্কিট করতে বলব যাতে পর্যটকদের গাড়ীর ধকল কম হয়। পর্যটন আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় হয়। অবশ্যই পর্যটকদের পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবস্থাপকদের সার্কিট সম্পর্কে এতটাই জ্ঞান থাকা দরকার যাতে কথা বলে পর্যটকদের সার্কিটগুলির ওপর যথার্থ বিশ্বাস জন্মায়। পাঁচ রাত/ছয় দিন করার কারণ যেহেতু আমাদের এ অঞ্চলে অধিকাংশ পর্যটক আসেন কলকাতা থেকে তাই একটা সপ্তাহের ছুটি নিলেই তাঁরা এই ছোট ছোট সার্কিটগুলো বারে বারে এসে ভ্রমণ করে নিতে পারবেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের এ অঞ্চলের পর্যটকেরা অধিকাংশই বাঙালী এবং এঁরা সুযোগ পেলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি অনেক পর্যটক এ এলাকার আকর্ষণে বারে বারে আসেন। তাই এ অঞ্চলের পর্যটনকে আকর্ষণীয় করে তোলার একটা কঠিন দায়িত্ব অবশ্যই আছে পর্যটন ব্যাবস্থাপকদের। যদি দেখা যায় একই পর্যটক বারে বারে আসছেন তবে বুঝতে হবে ব্যাবস্থাপনার সবকিছু সঠিক ভাবে চলছে। এভাবে সকলে মিলে আন্তরিকভাবে যদি উদ্যোগ নেওয়া যায় আমার গভীর বিশ্বাস অচিরে ডুয়ার্সের পর্যটন জনপ্রিয় হয়ে উঠবেই।