14/10/2024
Location: , Kalimpong
ভয়াবহ ! বিপজ্জনক !
কি নাম দেব এই অভিযানের ? শিহরন জাগানো দুঃসাহসিক এই অভিযান। পদে পদে সেখানে আমাদের বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো । লক্ষ্য করবেন , আমি বরাবরই ভ্রমণ না বলে, অভিযান বলে থাকি। কেন বলি ? কারণ, মৌজ করে, আরাম করে আমরা ঘুরতে বেরোই না।
আমাদের পথের মোড়ে মোড়ে থাকে চরম অনিশ্চয়তা! দুর্ভাবনা! বিপদের ঘনঘটা ! জীবন-মৃত্যুর হাতছানি! বিপদের কাঁটাকে পায়ে দলে যাওয়ার উল্লাস!
( ইয়েলবঙ। সাইকেলে মোট অতিক্রান্ত পথ ১৪৩ কিঃমিঃ)
এবারের অ্যাডভেঞ্চারের লক্ষ্য ছিলো ইয়েলবঙ। সন্ধ্যের দিকে আমি রুমে বসেছিলাম। হঠাৎ বিধান এসে জায়গাটা আমাকে দেখালো। এক ঝলক দেখেই লক্ষ্য স্থির। সেই মতো প্রস্তুতি, পরিকল্পনা চলতে লাগলো। দু’টো শনিবার চলে গেল, যাই যাই করেও নানান বাধাবিপত্তির কারণে যেতে পারলাম না। শেষমেষ গত ১৪-ই এপ্রিল, শুক্রবার বেড়িয়ে পড়লাম ভোর সাড়ে পাঁচটায়। সেই রাতেই হোস্টেলে ৬০ খানা রুটি, এক কেজি ছোলার ঘুগনি, দু ডজনের মতো ডিম সেদ্ধ ইত্যাদি তৈরি করে নিয়েছিলাম আর সঙ্গে ছিলো দু’ডজনের মতো কলা। ছয় বন্ধু মিলে সেবক হয়ে বাগরাকোট পৌঁছতে বেজে গেল নয়টা। সেখান থেকে ইয়েলবঙ ভিলেজ যেতে দুপুর একটা বেজে গেল। অসম্ভব কষ্টকর পথ ছিল এটা। খাড়া পাহাড়ের পাকদন্ডী ঘুরে ঘুরে উঠতে হচ্ছিল। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে একটানা সাইকেলকে হাতে ঠেলে ওঠাতে হয়েছিলো। মাথার ওপর প্রখর রোদ। ছবিতে দেখবেন এক-একজন বন্ধুর কি অবস্থা! অনেকেই টানতে না পেরে বসে পড়ছিলো রাস্তার ওপর। এরকম অভিযানের জন্য হেল্থ ফিটনেসের সঙ্গে সঙ্গে অদম্য মানসিক শক্তি ও উৎসাহ থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। রাস্তার অবস্থাও ভয়ানক। রাস্তা আসলে বানানো হচ্ছিলো। ধূলোতে পা ডুবে ডুবে যাচ্ছিলো। একটা ডাম্পার চলে গেলে ধুলোতে আর চোখ খুলবার, নিঃশ্বাস নেবার উপায় নেই। যাইহোক এভাবে, অনেক পরিশ্রমের পড়ে ইয়েলবঙ ভিলেজের সাইনবোর্ড আমাদের ওয়েলকাম জানালো। এটা ছিল আসলে ইয়েলবঙ মোর। মানে তখনো অবধি আমরা ইয়েলবঙ ভিলেজে পৌঁছতেই পারিনি। আবার ইয়েলবঙ ভিলেজ থেকে আরও কয়েক কি.মি. দূরে ইয়েলবঙ ক্যানিয়ন হলো আমাদের মেইন ডেসটিনেশান। যাইহোক, ইয়েলবঙ ভিলেজের পথে যেতে যেতে আমাদের মধ্যে ভয় হতে লাগলো, আদৌ আমরা ক্যানিয়নে পৌঁছতে পারবো কিনা ! বেলা দেড়টা পেড়িয়ে গেল, এখনও তো আমরা ইয়েলবঙ গ্রামে পৌঁছতেই পারিনি। সবার মনেই সংশয় , পৌঁছতে পারলেও আজ কি আর হোস্টেলে ফিরতে পারবো ? হোম-স্টে করে থাকবো না কি ? এইসব ভাবতে ভাবতে প্রবল অনিশ্চিয়তা নিয়ে বিকেল তিনটের দিকে ইয়েলবঙ গ্রামে পৌঁছতে পারলাম। কিন্ত এখানে দেখার কিছু নেই। আমাদের এখান থেকে আরও যেতে হবে প্রায় ১৩/১৪ কিঃমিঃ পাহাড়ী পথ, তাহলেই মিলবে ইয়েলবঙ ক্যানিয়ন। স্থানীয় একজনের কাছে শুনে নিলাম কি করে কোনদিক দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারবো ! N.B.U. থেকে এতটা পথ সাইকেলে এসেছি শুনে যেন তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কখন ক্যানিয়নে যাবো, কখন ফিরবো , এসব ভেবে উনি আমাদের সেখানে একমুহুর্ত দেরী না করে তক্ষুনি এগিয়ে চলার পরামর্শ দিলেন। পাহাড়ী পাথরের পথ ধরে ধরে প্রচুর হয়রানির পর অবশেষে ক্যানিয়ন যখন খুঁজে পেলাম তখন বিকেল পাঁচটা।
পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা নেমে আসছে। এখানে একটা ব্যাপার হলো, নীচে নেমে আপনি যতই জিজ্ঞেস করুন , ‘দাদা ক্যানিয়ন কোন্ দিকে?’ কেউ আপনাকে ঠিকঠাক বলবে না। যাইহোক, ক্যানিয়নের বর্ণনা আমার দিতেই ইচ্ছে করছে না। সেখানকার স্মৃতিটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! এখন ভাবলে আশ্চর্য লাগে , কি করে যে কি করলাম! দু’দিকে সুউচ্চ পাথরের মসৃণ দেওয়াল, মাঝখানে একটা ন্যারোও প্যাসেজ ! পা হড়কাতে হড়কাতে কতবার যে বেঁচে গিয়েছি, তার ইয়াত্তা নেই! মনেই হচ্ছিল না, সারাদিনের চরম অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এরকম সাংঘাতিক একটা জায়গায় আমরা আসতে পেরেছি ! আনন্দের সঙ্গে ভয় ভয় মেশানো কিরকম একটা যেন অনুভূতিতে আচ্ছন্ন ছিলাম সবাই । এদিকে সন্ধ্যা ছয়টা পার হয়ে অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। এখানে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা এসে পড়লো ! ক্যানিয়ন থেকে বেরোনোর মুখে দেখি বেশ কয়েকজন লোকাল গাইড ছেলেপেলে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধু দেবনাথ ফিসফিসিয়ে বললো, ‘ওরা আমাদের ধরবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।’ বুঝলাম, ওরা খেপেছে আমাদের ওপর! এখানে ট্রাভেলার্সরা আসে আর ওরা গাইড দেয়। এতে ওদের ফ্যামিলি একটা ইকনমিকাল সাপোর্ট পায়। কিন্ত আমরা ওদের নাকের ডগা দিয়ে , ওদেরকে এড়িয়ে নিজে ক্যানিয়ন খুঁজে বের করে, ট্রেক করে , ছবি তুলে চলে যাচ্ছি , এই যে ওদের কামাইয়ের ওপর ফাঁকি মেরে আর বোকা বানিয়ে চলে যাবো, এটা ওরা মানবে কেন? বন্ধু গোপেশ চুপিচুপি বললো, ‘আশুতোষদা, তুমিই পারবে ওদের বুঝিয়ে বলতে , তুমি ওদের বুঝিয়ে বোলো।’ কাছে যেতেই ওরা আটকালো। থামলাম। অনেক কথা বলতে লাগলো। চারশো থেকে পাঁচশো ফাইন চেয়ে বসলো। এদিকে যথারীতি অন্ধকার হয়ে গিয়েছে । একটুও মাথা গরম না করে, একদম বিপন্নের মতো করুন ছাপ নিয়ে বললাম -- ‘ ভাইয়া, একবাত্ দিমাগ ঠান্ডা করকে সোচো , অগর্ হামারে পাস পয়সে হি হোতা, তো থোরে না হাম ইতনা রিস্ক লেকে, ইতনা তকলিফ্ উঠাকর অ্যায়সে সাইকেল মে ঘুমনে আয়ে ? হামলোগ তো রিসর্ট মে ভি রহে সাকতে থে না ? আসলমে হাম স্টুডেন্ট হে। ক্যায়সা ভি করকে দো’শো মিলা, ইনমে সে একশৌ’ রাখ লো, অউর বাকি কা হামারা লটতে ওয়াক্ত কুছ হো যায় তো ...” ব্যাটারা কি জানি কি বুঝলো। এক টাকাও নিলো না। এই ঘোর অসময়ে অন্ধকারে নির্জন পাহাড়ি পাথুড়ে নদীপথে ওদলাবাড়ি যাবো শুনে ওরাও ভয় পেয়ে গেল। পথে হাতির দেখা পেতে পারি সাবধান করে দিল। ওরা বললো দেড় ঘন্টা গেলে ওদলাবাড়ির পথ পাবো ! কি অনিশ্চয়তা! যদি অন্ধকারে পথ না দেখতে পাই ? তখন?আমরা দেরি না করে সাইকেল নিয়ে চলতে শুরু করলাম।
এরকম ভয়ানক পথে আমি জীবনে যাইনি কখনো। দুই ধারে উঁচু উঁচু কালো কালো পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে অজস্র পাথরে বিছানো শুঁকনো নদী। অনবরত বাতাসের রহস্যময় শোঁ শোঁ শব্দ।সেই জনহীন এলাকায় আমরা মাত্র ছয়টি প্রাণী এগিয়ে চলেছি! ভাবা যায় ? সবার সামনে বিধান । আর আমি সবার পেছনে। সাগর বলছিলো, “আশুদা, আমার ভয় করে , তুমি পেছনে থাকো। ” যেতে যেতে সবাই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম। দূরে কালো কালো কি ? হাতির পাল নাকি ? শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসছিলো! বিধানের কথায়, “আমি তো সামনে ছিলাম। দূরে বড় বড় কালো পাথর দেখে বার বার মনে হচ্ছে হাতি দাঁড়িয়ে আছে !” আমি সবাইকে বলেছি, শব্দ না করে চুপচাপ চলতে। ফোনের লাইট জ্বালানো হয়নি। নদী আর ফুরোয় না! এরমধ্যে গোপেশের সাইকেলের সীট ভেঙে গেল ! এটা আর এক বিপত্তি! যাইহোক জামাকাপড়, গামছা ইত্যাদি বেঁধে দিয়ে কোনোক্রমে বসে চালানোর উপযোগী করে দিলাম আমি। অন্ধকারে উঁচু পাহাড়ি জঙ্গলে অনেকটা জায়গায় কেমন লাল আগুন লকলক করে জ্বলছিল। দাবানল ছিলো ওটা। ভয়ানক লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো হলিউডি ফিল্মের রিয়েল স্পটে যেন গিয়ে পড়েছি ! অনেক সময় পর ওদলাবাড়ি রোডে গাড়ির আলো দেখতে পেলাম! যাক্! বাঁচা গেল! উল্লাস করে উঠলো বন্ধুগনস্ !
ওদলাবাড়ি থেকে বাগড়াকোটে এসে পৌঁছলাম,সাড়ে আটটা বাজে তখন। একটা ধাবায় ঢুকে খেয়ে নিলাম সবাই। খাওয়া হয়ে যখন বাইরে সবাই রেস্ট করছিল, তখন আর এক কান্ড ! গুন্ডার মতো দেখতে মস্ত কালো একটা লোক এসে বন্ধুদের বলছিলো , আমরা কয়লা নিয়ে এসেছি নাকি ! বন্ধুরা নিজেদের ছাত্র পরিচয় দিয়েছিলো। আমার খাওয়া সবার শেষে শেষ করে আমি যখন ওদের কাছে যাচ্ছিলাম, তখন লোকটাকে বলতে শুনলাম, না, আমি মানুষ চিনি । আমি প্রথমে বিশেষ আমল দিইনি। শেষে সবাই মিলে কথা বলতে বলতে সে বুঝলো আমরা সত্যিই ছাত্র ,কয়লা পাচারকারী নয়। কথায় কথায় খাতির হয়ে গেল। জানা গেল এককালে সে নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছিলো। কিন্ত এখন সে কয়লা মাফিয়া। আসলে আমাদের সাইকেল, হাফ প্যান্ট, গামছা , আর সারা শরীরে পরিশ্রমের ছাপ দেখে আমাদের কয়লা পাচারকারী ভেবে কেউ তাকে ফোন করে খবর দিয়েছিলো। অল্পের জন্য বিপদের মুখ থেকে বাঁচলাম।
এত রাতে শিলিগুড়ি ফিরবো শুনে উপস্থিত সকলের মুখে ছিল তীব্র উৎকণ্ঠা। যাইহোক, আবারো সাইকেল নিয়ে আমরা রোড ধরে চলতে চলতে রাত্রি ১০.০০ টায় এসে পৌছলেম সেবক। এখানে শর্টকাট হবে বলে সেবক রেলব্রিজ হয়ে সবাই পার হয়ে এলাম, করোনেশন ব্রিজ হয়ে গেলে অন্ততঃ চার কিঃ মিঃ বেশি ঘুরে আসতে হতো । এটা ছিল আরও একটা চ্যালেঞ্জ! নীচে ভয়ংকর শব্দ করে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নদীস্রোত বয়ে চলেছে আর ওপরে ঝরের গতিবেগে বইছে হাওয়া! কোনোরকমে প্রাণ হাতে করে ব্রিজ পেরোলেম সবাই। ওরা এগিয়ে গিয়েছিল। আমি পেছনে ছিলাম। আবারো ভাগ্যের ফের! এক রেলপুলিশ এসে আমার পথ আটকালো। এনাকেও বুঝিয়ে বলতে হলো। বুঝলেন! আশ্চর্য হলেন। আর সাবধান করলেন, এভাবে যাতে ব্রিজ পার না হই।
সেবকে পৌঁছে খবর পাওয়া গেল মাঝখানের জঙ্গলে নাকি চিতা বেড়িয়েছে ! এখন এর থেকে চরম দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে। সেখানে এক দোকানদার দিদিসহ উপস্থিত সবাই আমাদের জঙ্গলের রোড হয়ে শিলিগুড়ি যেতে বারবার বারণ করতে লাগলো। এদিকে রাত গভীর হচ্ছে। পড়ে গেলাম মহাফাঁপরে ! কি করি এখন? সবাইকে বললাম, খালি লড়ি দেখলেই সকলে মিলে হাত তুলতে । রামকৃষ্ণ সহায় ! সৌভাগ্যক্রমে প্রথম ডাম্পারটিই কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। দৌড়ে গিয়ে সব বললাম। বন্ধু আব্দুলদের নাকি ড্রাইভারটা জিজ্ঞেস করেছিলো, “লিলিগুড়ি যাবে, সে ঠিক আছে, কিন্ত তোমরা কোথায় গিয়েছ?” আমার বিশ্বাস, উত্তর শুনে ড্রাইভারের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিলো মনে হয়। যাইহোক ছেলেটা বড়ো ভালো ছিল। সবাই মিলে সাইকেল নিয়ে উঠে পড়লাম। শালুগারায় সে আমাদের নামিয়ে দিল। সাইকেলে নামিয়ে দিয়ে আমি কৃতজ্ঞতাবোধে তাকে জলখাবারের টাকা দিতে গিয়ে তার ট্রাক বেড়িয়ে গেল। কিছু কিছু সাহায্যের কোনো জলখাবার হয় না । শুধু ঋণ হয়। রামকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করি, ভবনদীর কান্ডারী তার সহায় হোন।
শালুগারা থেকে নেমে ঘুমের ঘোরে টলতে টলতে সাইকেল চালিয়ে রাত সাড়ে বারোটার দিকে হোস্টেলে এসে পৌঁছলাম। ভাগ্যক্রমে বেঁচেছি। সাইকেল চালাতে চালাতেই কতবার যে চোখ লেগে গিয়ে মেইন রোডে চলে গিয়েছিলাম, ভাগ্যিস কোনো গাড়ি এসে আমাকে পিষে দেয়নি এই যা! মুখের কথা আমার পুড়ো জড়িয়ে এসেছিলো। হোস্টেলে ফিরে স্নান সারবো তাই শিবমন্দিরের দোকানে গিয়ে শ্যাম্পু - সাবান কিনতে গিয়ে বুঝলাম, দোকানদার আমাকে মাতাল ভেবেছে।
দোকানদার ঠিক ভেবেছে। শুধু কিসের নেশায় মাতাল ,তা সে ঠিক করে জানে না। জানলে ওরকম করে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাতো না ।
জয়গুরু ।
Total March of Journey by Cycling: 143 KM.