22/10/2025
অবশ্যই! সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার জন্য নেওয়া নতুন পদক্ষেপ ও আইনগুলো নিচে বাংলা ভাষায় সহজ করে বোঝানো হলো।
সৌদি আরব তাদের ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে শ্রম বাজারকে আরও ন্যায়সঙ্গত ও আকর্ষণীয় করার জন্য প্রবাসী কর্মীদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর জন্য তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি এবং ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে।
মূল সংস্কার এবং উদ্যোগসমূহ
১. কাফালা পদ্ধতির পরিবর্তন (Kafala System Replaced)
ঐতিহ্যবাহী কাফালা (Kafala) বা স্পন্সরশিপ পদ্ধতি বাতিল করে একটি নতুন চুক্তিনির্ভর সম্পর্ক চালু করা হয়েছে। এটি কর্মীদের স্বাধীনতা ও গতিশীলতা বাড়াতে একটি বিশাল পদক্ষেপ।
চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতা: কর্মীদের এখন চুক্তি শেষে বা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বর্তমান নিয়োগকর্তার অনুমোদনের প্রয়োজন ছাড়াই নতুন চাকরিতে যাওয়ার অধিকার আছে।
ভ্রমণের স্বাধীনতা: কর্মীরা এখন নিয়োগকর্তার অনুমতির প্রয়োজন ছাড়াই ইলেকট্রনিকভাবে জানিয়ে স্থায়ীভাবে বা ছুটিতে দেশে ফিরতে বা দেশ ছাড়তে পারবেন।
লক্ষ্য: এর ফলে শ্রম বাজারের আকর্ষণ বাড়বে এবং কর্মীদের স্বাধীনতা ও সম্মান নিশ্চিত হবে। বর্তমানে দশ লাখেরও বেশি কর্মী এই সুবিধা পাচ্ছেন।
২. মজুরি সুরক্ষা কর্মসূচি (Wage Protection Program - WPP)
এই ডিজিটাল পদ্ধতিটি নিশ্চিত করে যে কর্মীরা যেন তাদের মজুরি বা বেতন ঠিক সময়ে এবং চুক্তি অনুযায়ী পান।
কার্যকারিতা: এটি একটি ইলেকট্রনিক সিস্টেম, যা বেসরকারি খাতের সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের (সৌদি ও প্রবাসী) বেতন পরিশোধের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে।
সুবিধা: এর ফলে মজুরি প্রদানে স্বচ্ছতা আসে এবং শ্রমিক বিরোধ বাড়ে না। এই প্রোগ্রামটি ৮৫ লাখেরও বেশি কর্মীর মজুরি সুরক্ষিত করেছে। এটি শ্রম বিরোধ কমাতে, নগদ লেনদেনের উপর নির্ভরতা কমাতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করেছে।
অন্যান্য সুবিধা: এটি কর্মীদের জন্য নূন্যতম মজুরি এবং চুক্তি শেষ হলে সার্ভিস শেষের ক্ষতিপূরণ (end-of-service compensation) নিশ্চিত করে।
৩. গৃহকর্মীদের জন্য মুসান্দ প্ল্যাটফর্ম ও বীমা (Musaned Platform and Insurance for Domestic Workers)
মুসান্দ (Musaned) প্ল্যাটফর্ম গৃহকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের অধিকার রক্ষা করে।
চুক্তি বীমা: পাঁচ লাখেরও বেশি গৃহকর্মীর চুক্তি এখন বীমার আওতায়। এই বীমা কর্মী এবং নিয়োগকর্তা উভয়ের অধিকার রক্ষা করে।
কর্মীর জন্য: দুর্ঘটনার কারণে স্থায়ীভাবে সম্পূর্ণ বা আংশিক অক্ষমতা হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এছাড়া, নিয়োগকর্তার মৃত্যু বা অক্ষমতার কারণে বেতন ও আর্থিক পাওনা দিতে ব্যর্থ হলে কর্মীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
নিয়োগকর্তার জন্য: কর্মী পালিয়ে গেলে, মারা গেলে বা কাজ করতে অক্ষম হলে নিয়োগের খরচ বাবদ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়।
ইউনিফাইড কন্ট্রাক্ট: এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি তৈরি করা হয়, যা উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করে।
সেবা স্থানান্তর: মুসান্দ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন গৃহকর্মীর পরিষেবা এক নিয়োগকর্তার থেকে অন্যজনের কাছে স্থানান্তর করা যায়।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অধিকার ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা
কাজের সময় ও ছুটি:
দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা বা সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঁচ ঘণ্টা একটানা কাজের পর কমপক্ষে আধা ঘণ্টার বিরতি দিতে হবে।
কর্মীরা ন্যূনতম ২১ দিনের বার্ষিক সবেতন ছুটি পান, যা পাঁচ বছর একটানা কাজ করার পর ৩০ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
মৃত্যু, বিয়ে বা সন্তানের জন্মের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতেও বিশেষ ছুটি দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা:
কাজের জায়গায় আঘাত বা রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতি তৈরি করা হয়েছে।
গ্রীষ্মকালে (১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরের প্রচণ্ড গরমে (১২টা থেকে ৩টা) বাইরে কাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে কর্মীরা হিট স্ট্রেস থেকে রক্ষা পান।
অভিযোগ নিষ্পত্তি:
শ্রম আইন লঙ্ঘন রিপোর্ট করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল চ্যানেল (যেমন: মন্ত্রণালয়ের অ্যাপ) রয়েছে।
শ্রম সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত ও ন্যায্যভাবে সমাধানের জন্য শ্রম আদালত স্থাপন করা হয়েছে।
নারী কর্মীদের অধিকার:
শ্রম আইনে লিঙ্গ বা অন্য কোনো কারণের ভিত্তিতে বেতন বৈষম্য নিষিদ্ধ করে পুরুষ ও নারীর জন্য সমান মজুরি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দক্ষতা যাচাই:
পেশাদার স্বীকৃতি কর্মসূচির (Professional Accreditation Program) মাধ্যমে কর্মীদের সৌদি আরবে আসার আগেই তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার মান যাচাই করা হয়।
এই সমস্ত আইন ও পদক্ষেপ সৌদি আরবের শ্রম পরিবেশকে উন্নত করতে, কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং দেশকে বৈশ্বিক প্রতিভার জন্য আরও আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পরিণত করতে সাহায্য করছে।